০৩:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কঠিন চীবর দানের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য

দানশ্রেষ্ঠ শুভ কঠিন চীবর দানোৎসব বাঙালি বৌদ্ধ সমাজে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান। শরৎকালীন এই সময়ে বৌদ্ধদের গ্রামে গ্রামে প্রবারণা ও কঠিন চীবর দানোৎসব একটি আনন্দমূখর ধর্মীয় উৎসব ও সম্মিলন অভূতপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি করে। বাঙালি বৌদ্ধরা এই দিনটি উদযানের জন্য সারাবছর প্রতীক্ষায় থাকে। এখানে প্রত্যেকে ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান দিয়ে যেমন অসীমপুণ্য সঞ্চয় করে তেমনি দান-শীল-ভাবনাদির দেশনা শ্রবণ করেও অধিকতর প্রশান্তি লাভ করে। যা বছরে অন্যন্যা সময়ে এই সুযোগ আসেনা। ভিক্ষুদের তিনমাসের বর্ষাবাস অধিষ্ঠানের পরদিন থেকে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে কঠিন চীবর দানোৎসব উদযাপিত হয়। এতে প্রতিটি বিহারে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে উৎসবে মুখরিত হয়। তাই এই দানের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলায় কঠিন চীবর দান প্রচলনের সূত্রিতা : বঙ্গীয় অঞ্চলে বহুপূর্বে কঠিন চীবর দান প্রচলিত ছিল, কিন্ত খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় প্রভৃতি কারণে ধর্মের বিপর্যয় ঘটলে অন্যান্য ধর্মীয় আচার আচরণের মতো কঠিন চীবর দান প্রথাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। বৌদ্ধ দেশ শ্রীলঙ্কা থেকে বাঙালি বৌদ্ধদের প্রতিথযশা সাঙ্ঘিক ব্যক্তিত্ব রাজগুরু ধর্মরত্ন মহাস্থবির (রাঙ্গুনিয়া) স্বদেশে এসে সর্বপ্রথম আচার্য ভগবান চন্দ্র মহা¯’বিরকে ভিত্তি করে সৈয়দবাড়ী ধর্মচক্র বিহারে ১৯১৩ সালে দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান দিয়ে শুধু গুরু পূঁজা করেনি নতুন করে কঠিন চীবর দানের শুভ সূচনা করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাছাড়াও পটিয়া নাইখাইন সন্তোষালয় বিহারে ১৯১৪ সালে বিনায়াচার্য বংশদীপ মহাস্থবির মহোদয় আর্যশ্রাবক ভদন্ত জ্ঞানীশ্বর মহাস্থবিরকে ভিত্তি করে কঠিন চীবর দান দিয়ে আরেকটি নব ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সপ্তম সংঘরাজ সদ্ধর্মকীর্ত্তি অভয়তিষ্য মহাস্থবির ও পণ্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির কঠিন চীবর দানের ব্যাপক প্রসার ঘটান অন্যান্য গুণী-জ্ঞানী মহাস্থবিরদের সহযোগে।
বর্ষাব্রত এবং কঠিন চীবর দানের প্রবর্তন : একসময় মহাকারুণিক তথাগত সম্যকসম্বুদ্ধ দায়কগণের অভিযোগ এবং সকলের হিত-মঙ্গল কামনা পূর্বক উপলব্ধি করে বর্ষা মৌসমে ভিক্ষুরা গ্রামাঞ্চলে পদব্রজে ভ্রমণ করত: শত শত ফসলের ক্ষতি এবং বন্যপ্রাণীর ক্ষতি সাধিত হত। তখন থেকে তথাগত বুদ্ধ নিয়ম প্রবর্তনের অনুজ্ঞা প্রদান করলেন, “হে ভিক্ষুসংঘ আমি নির্দেশ প্রদান করছি বর্ষা মৌসমের তিনমাস তোমরা ভ্রমণ করবে না।” এ তিনমাস তোমরা একান্তে থেকে, একত্রে থেকে শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা অনুশীলন করবে। তখন থেকে ‘বর্ষাব্রত’ প্রথা প্রবর্তিত হয় এবং অদ্যবধি পূজনীয় ভিক্ষুসংঘ আষাঢ়ী পূর্ণিমার পরদিন থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিনমাস সুচারুরূপে বর্ষাব্রত পালনের পর মহাণ প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপনের মধ্য দিয়ে মহান ব্রত বর্ষাবাস সমাপন করেন। বর্ষাবাস সময়কালীন ভিক্ষুসংঘরা ধ্যান, ধর্মচর্চা, গবেষণা, ত্রিপিটক সাহিত্য অনুশীলন, গবেষণা ও শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ভিক্ষু জীবনকে পরিশুদ্ধ এবং সম্যক জ্ঞান উপলব্ধিতে আত্ম নিয়োগ করে থাকেন। অন্যদিকে গৃহীরাও প্রত্যেক অষ্টমী, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে অষ্টশীল পালন, ধ্যানচর্চা অনুশীলনের মধ্যদিয়ে আত্ম নিয়ন্ত্রণের সম্যক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
কথিত আছে, মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধ তাঁর পঞ্চম বর্ষা অনাথপিণ্ডিক নির্মিত শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে অবস্থান করেছিলেন। তখন পাঠেয়বাসী পশ্চিমাদেশীয় ত্রিশজন ভিক্ষু বর্ষাবাস শেষে বুদ্ধ দর্শনের জন্য শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে এসেছিলেন। বুদ্ধ সেই ত্রিশজন ভিক্ষুর পরিহিত চীবরের করুন অবস্থা দেখে অনুজ্ঞা প্রদান করেছিলেন। আজ থেকে কোন গৃহী যদি ভিক্ষু সংঘকে চীবর দান করে তবে সেই চীবর ভিক্ষু সংঘ ব্যবহার করতে পারবে। তখন থেকে ভিক্ষু সংঘ গৃহী প্রদত্ত চীবর পরিধান করা শুরু করেন।
কঠিন চীবর দান প্রচলনের পূর্বে ভিক্ষুসংঘ পাংশুকুলিক চীবর (শ্মশানে বা অন্য কোথাও পড়ে থাকা ময়লা ছিন্নবস্ত্র) পরিধান করত। এতে ভিক্ষুদের রোগাক্রান্ত হওয়া এবং স্বাস্থ্যহানি ঘটার সম্ভাবনা থাকতো প্রচুর। ভিক্ষুদের সুস্বাস্থ্য ও নীরোগ দেহের কথা চিন্তা করে রাজগৃহে বর্ষাবাসকালে তথাগত বুদ্ধ চীবর অর্থাৎ পরিস্কার বস্ত্র পরিধান করার অনুমতি দেন। তারপর থেকে সাধারণ গৃহীরা ভিক্ষুদের চীবর দান দেওয়া শুরু করেন। তবে সকল ভিক্ষুরা কঠিন চীবর গ্রহণ করতে পারে না, যারা বিনয়সম্মতভাবে ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান সমাপ্ত করেন তারাই একমাত্র কঠিন চীবর লাভ করতে পারে। তাঁদেকে কঠিন চীবর লাভী ভিক্ষু বলা হয়।
ত্রিপিটক সাহিত্যে কঠিন চীবর প্রস্তুত প্রণালী : ‘চীবর’ শব্দের অর্থ ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্র। গাছের শেকড়, গুঁড়ি, ছাল, শুকনো পাতা, ফুল ও ফলের রঙ অনুসারে এর ছয়টি রঙ নির্দিষ্ট। তবে ভিক্ষুসংঘ সাধারণত লাল ফুলের রঙের চীবরই বেশি ব্যবহার করে, যা সাধারণ গৃহীদের পরিধেয় বস্ত্র থেকে পৃথক ও বৈচিত্রহীন। কঠিন চীবর প্রস্তুত করার চার প্রকার প্রণালী। যথা : (১) যে দিন কঠিন চীবর দান করা হবে সে দিনের হতে তারপরের দিনের সূর্যোদয়ের পূর্বের মুহূর্ত পর্যন্ত এই চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই সুতা কাটা হতে আরম্ভ করে কাপড় বুনা, সেলাই করা ইত্যাদি চীবর প্রত্যেকের যাবতীয় কার্য সম্পাদন করতে হবে। (২) পরিমাণমত শ্বেত বস্ত্রে চীবর সেলাই ও রঙ করে দান দিতে হয়। (৩) পূর্বের সেলাই ও রঙ করা চীবর দ্বারা কঠিন চীবর দান দেওয়া যায়। (৪) সেলাই না করে শ্বেতবস্ত্র কঠিন চীবর দান দিতে পারে। তবে সে বস্ত্রটি চীবরে পরিণত করে পরদিন সূর্যোদয়ের পূর্বেই কঠিন চীবর করে নিতে হবে। ত্রিচীবর (সংঘাটি, অর্ন্তবাস, উত্তরাসঙ্ঘ) এ তিনের যে কোন একটি চীবর দ্বারা কঠিন চীবর দান কারা যেতে পারে। বুদ্ধ বলেছেন, জগতে প্রচলিত যত প্রকার দান আছে সর্বাপেক্ষা কঠিন চীবর দান হলো দানের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। ভিক্ষু-শ্রামণ, দায়ক-দায়িকা যে কেউ কঠিন চীবর দান দিতে পারে। কঠিন চীবর দান করতে হলে প্রথমে কমপক্ষে পাঁচজন ভিক্ষু সংঘের সম্মুখে চীবর উপস্থিত করে যথানিয়মে দান দিতে হয়। এ দানের দ্বারা শ্রেষ্ঠ সর্বপ্রকার পুণ্য লাভ হয়।
কঠিন চীবর বলার কারণ : ‘চীবর দান’ কথাটির সাথে ‘কঠিন’ শব্দটি যুক্ত হওয়ার কারণ সম্পর্কে ত্রিপিটকের অর্ন্তগত বিনয় পিটকের মহাবগ্গ গ্রন্থে’ বলা হয়েছে, “যেদিন চীবর দান করা হবে সেদিনের সূর্যোদয় থেকে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়ের অর্থাৎ ২৪ ঘন্টার মধ্যে সুতাকাটা, কাপড় বোনা, কাপড় কাটা, সেলাই ও রঙ করা, ধৌত করা ও শুকানো সহ যাবতীয় কাজগুলি সম্পন্ন করে উক্ত সময়ের মধ্যেই এ চীবর ভিক্ষুসংঘকে দান করতে হবে।” এছাড়া আরও কিছু নিয়ম-কানুন আছে, যা দাতা এবং গ্রহীতা উভয়ের জন্যই পালন করা বেশ কঠিন। কঠিন চীবর দান জন্মজন্মান্তরে সুফল প্রদান করে। প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে, যে বিহারে ভিক্ষুসংঘ বিনয়সম্মত বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান করে সে বিহারে বছরে একবার মাত্র কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এদিন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উপাসক-উপাসিকারা ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান দিয়ে থাকে। ভিক্ষুসংঘও তাদের বিনয়-বিধানের সকল নিয়ম অক্ষুন্ন রেখে পরিদেয় বস্ত্র হিসেবে এ চীবর গ্রহণ ও ব্যবহার করে।
কঠিন চীবর লাভী ভিক্ষুর পঁঞ্চ দোষ মুক্তি ও পঁঞ্চ প্রকার ফল :
(১) না বলে যেখানে সেখানে গমন করা। অর্থাৎ পূর্বাহ্নের জন্য নিমন্ত্রিত ভিক্ষু নিমন্ত্রণকর্তার গৃহ হতে সঙ্গী ভিক্ষুকে জিজ্ঞেস না করে অন্য গৃহে গমন।
(২) ত্রি চীবর বিহীন যেখানে সেখানে বিচরণ করা। অর্থাৎ অধিষ্ঠানকৃত ত্রি-চীবর রাত্রিতে নিজের হস্তপাশে বা দেড় হাতের মধ্যে রেখে সূর্যোদয় করা।
(৩) গণভোজনে গমন করা। অর্থাৎ চারজনের অনধিক ভিক্ষু নিমন্ত্রণ গ্রহন করে ভোজন করা।
(৪) ইচ্ছামত চীবর ব্যবহার করা। অর্থাৎ অতিরিক্ত চীবর যত ইছা তত অধিষ্ঠান কিংবা বেনামা করে নিজের অধিকারে রাখা।
(৫) যে স্থানে যত চীবর পাওয়া যায় সব তাদের অধিকারে রাখা। অর্থাৎ যে বিহারে যাঁরা কঠিন চীবর লাভ করেন সে বিহারে ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্যে যত চীবর প্রদত্ত হয় তৎসমুদয় তাঁদের অধিকারে থাকা। তাতে কোন আগুন্তক ভিক্ষুর অধিকার থাকে না। উল্লেখ্য, যেদিন হতে ভিক্ষু কঠিন চীবর লাভ করেন সেদিন থেকে ফাল্গুনী পূর্ণিমা পর্যন্ত উপরোক্ত পাঁচ প্রকার দোষ হতে মুক্ত থেকে পাঁচ প্রকার বিশেষ ফল লাভ করেন।
কঠিন চীবর দাতাগণের পাঁচটি বিশেষ সুফল লাভ :
(১) যেকোন জায়গায় তাঁরা বিপদমুক্ত, অন্তরায়-উপদ্রব মুক্ত হয়ে বিচরণ করতে পারে।
(২) আগুন, পানি, অসৎ রাজা, চোর এবং অকৃতজ্ঞ বা বিশ্বাসঘাতক লোকেরা তাঁদের সম্পত্তি বিনষ্ট করতে পারে না।
(৩) তাঁরা শত্রু ও অকল্যাণমিত্রদের সহিদ দেখা হয় না।
(৪) তাঁরা প্রচুর পরিমাণে ভাল কাপড় পরিধান করতে পারে এবং কখনো কাপড়ের অভাববোধ করে না।
(৫) তাঁরা স্বকীয় সম্পত্তির মালিকানা হতে বিচ্যুতি হয় না এবং তাঁদের সম্পত্তিগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়।
কঠিন চীবর দানের মাহাত্ম্য :
কঠিন চীবর দান পৃথিবীতে যত প্রকার দান আছে তাদের মধ্যো সর্বশ্রেষ্ঠ দাননুষ্ঠান। মহাকারুণিক ভগবান বুদ্ধ চৌদ্দতম বর্ষবাস যাপনকালে পাঠেয়বাসী ত্রিশজন ভিক্ষুকে উপলক্ষ্য করে দানশ্রেষ্ঠ কঠিন চীবর দানের প্রবর্তন করেছিলেন। ভগবান বুদ্ধ একসময় পঞ্চশত ষড়াভিজ্ঞ অরহত ভিক্ষুসংঘসহ আকাশপথে যেয়ে হিমালয়ের “অনোবতপ্ত” নামক মহাসরোবরে উপস্থিত হলেন। অতপর ধর্মরাজ গৌতম বুদ্ধ সহস্রদলপদ্মে উপবেশন করলেন এবং পঞ্চশত ভিক্ষুসংঘ তারাগণের ন্যায় বুদ্ধকে পরিবেষ্টন করে শতদল পদ্মে উপবেশন করলেন। এই অরহতসংঘকে সম্বোধন করে শতপুণ্য লক্ষণ তথাগত বুদ্ধ বললেন-‘হে ভিক্ষুসংঘ, তোমরা এখানে উপবিষ্ট হয়ে কঠিন চীবর দানের মাহাত্ম্য শ্রবণ করো।’ সেই শুভ মুহূর্তে বুদ্ধ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে অরহত নাগিত স্থবির দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দানের ফল বলতে আরম্ভ করলেন।
কঠিনদানং দত্বান সংঘে গুণ বরুত্তমে,
ইতো তিংসে মহাকপ্পে নাভিজানামি দুগ্গতিং।
অর্থাৎ উত্তম গুণ-শ্রেষ্ঠ সংঘ মাঝে কঠিন চীবর দান দিয়ে এ কল্প হতে বিগত ত্রিশ কল্প পর্যন্ত দুর্গতি কি অনুভব করি নাই।
কঠিন চীবর দানের মহৎ ফল বর্ণনা করতে গিয়ে সিখী বুদ্ধ বলেছেন-
যাবতা সব্বদানানি একো বস্সসতং দদে,
একস্স কঠিন দানস্স কলং নগ্ঘন্তি সোলসিং।
অর্থাৎ সর্বপ্রকার দান শতবর্ষ ব্যাপী দান করলেও, একটি কঠিনচীবর দান-পুণ্যের ষোলভাগের একভাগও পুণ্য হয়না আত্মত্যাগী পরকল্যানে ব্রতে উৎসর্গীত বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান পরিসমাপ্তিতে একমাসব্যাপী ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে দানোত্তম কঠিন চীবর দান উৎসবে যোগদান করে বুদ্ধের নির্বাণপ্রদায়ী মহাণ বাণী বহুজনের হিত, সুখ ও মঙ্গলের জন্য প্রচার করে থাকেন। এই পৃথিবীতে যতপ্রকার দান আছে যা একখানা কঠিন চীবর দানের তুলানায় ঐ দানের ফল ষোল ভাগের একভাগও হয় না। একনিষ্ট ব্রহ্মলোক পরিমাণ উচ্চ রৌপ্য পর্বত দান করলেও একখানা কঠিন চীবর দানের তুলনায় ঐ রৌপ্য পর্বত দানের ষোল ভাগের একভাগও হয় না। অতীতকালে মহাকারুনিকো শরণঙ্কর বুদ্ধের সময়ে ভগবান গৌতম বুদ্ধের অগ্রশ্রাবক “সারিপুত্র মহাথেরো” এক রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নাম ছিল “কম্বলরাজ কুমার”। যথাকালে তিনি রাজপদে অভিসিক্ত হয়েছিলেন। একদিন কম্বলরাজ কুমার বিহারে গিয়ে বুদ্ধকে বন্দনা করে বললেন- ভন্তে, এখন আমরা কোন পুণ্য কর্ম সম্পাদন করব? ব¯‘দানের মধ্যে যে দান সর্বোৎকৃষ্ট, সে দান সম্পর্কে আমাদিগকে দেশনা করুন। তখন মহাকারুনিকো শরণঙ্কর বুদ্ধ কঠিন চীবর দানের ফল বর্ণনা করে বললেন,
১. যে ব্যক্তি ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দানের জন্য বস্ত্র ক্রয় করে দেয় সে ব্যক্তি সর্বদা মনুষ্যলোকে মহাধনী, মহাযশস্বী ও মহাভোগ সম্পদশালী হয়।
২. যে ব্যক্তি সুতা তৈরী করে দেয় সে সর্বদা মনুষ্যলোকে সুখ ভোগ করে এবং সর্বদা সর্বকর্মে বিশারদ হয় ও কোন জন্মে কুজ হয়ে জন্ম লাভ করে না।
৩. সংঘকে কঠিন চীবর দানের জন্য যে ব্যক্তি বস্ত্র ছেদন করে দেয়, সে জন্মে জন্মে ধর্মত: অর্থাজনে পারদর্শী ও নিপুন হয়।
৪. যে ব্যক্তি ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর সেলাইয়ের ব্যবস্থা করে দেয় সে মনুষ্যলোকে ঐশ্বর্যশালী ও মহাপ্রভাবশালী হয়। সে মনুষ্যলোক থেকে চ্যুত হয়ে দেবলোকে উৎপন্ন হয় এবং তথায় সর্বদা দেবগণের শ্রেষ্ঠ হয় ও ঐশ্বর্যশালী দেবতা হয়ে তথায় সর্বদা সুখভোগ করে থাকেন।
৫. যে ব্যক্তি ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান দেবার জন্য কঠিন চীবর সেলাই করে সে জন্ম জন্মান্তরে সুরূপ হয়, মহাপ্রজ্ঞাবান এবং সর্বদা সুখভোগ করে। সে ভবে ভবে চর্তুদ্বীপের ঈশ্বর চক্রবর্ত্তী রাজা হয় এবং অসংখ্যবার প্রদেশের রাজত্ব প্রাপ্ত হয়। সেখান থেকে চ্যুত হয়ে দেবলোকে উৎপন্ন হয় এবং সর্বদা দিব্যসুখ ভোগ করে।
৬. যে ব্যক্তি ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান দেয়ার জন্য বস্ত্র রঞ্জন (রং) ও ধৌত কর্ম করে সে মনুষ্যলোকে উৎপন্ন হলে সর্বদা সুখী ও নিরোগী হয়। সে সুবর্ণ শরীর লাভ করে এবং সুরূপ সর্বজনের চিত্ত প্রসাদকর প্রিয়দর্শন হয়। সে দেবলোকে উৎপন্ন হলে দেবগণের প্রিয় হন।
৭. যে ব্যক্তি কঠিন চীবরের গ্রন্থী (গিরা) সুতা দান করে সে সর্বদা পরিশুদ্ধ অবস্থা সম্পন্ন হয়ে সংসরণ করে, সে জন্মে জন্মে অপায়ে উৎপন্ন হয় না।
৮. যে ব্যক্তি শ্রদ্ধার সহিত কঠিন চীবর ধৌত করে সে সুগতি প্রাপ্ত হয়। সর্বদা সে নরলোকে সুখী হয়। সে সর্বদা সগৌরবে পূজিত ও সৎকার প্রাপ্ত হয় এবং মহাযশস্বী মহাভোগসম্পদশালী ও দীর্ঘায়ু সম্পন্ন হয়। সে সর্বদা দেবলোকে দেববৃন্দের এবং মনুষ্যলোকে মনুষ্যদের শ্রেষ্ঠ হয়। এভাবে বুদ্ধ কঠিন চীবর দানর ফল ব্যাখ্যা করেন।
পালি সাহিত্যে উল্লেখ আছে, তথাগত বুদ্ধ কঠিন চীবর দানের ফল বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে পাঁচশ জন অরহত ভিক্ষুসহ হিমালয়ের অনোবতপ্ত নামক মহাসরোবরে উপনীত হয়েছিলেন। সেখানে বুদ্ধ সহসদল পদ্মে এবং ভিক্ষুগণ শতদল পদ্মে উপবেশন করলে প্রথমে নাগিত স্থবির এবং পরে স্বয়ং তথাগত বুদ্ধ কঠিন চীবর দানের অক্ষয় অপরিমেয় পুণ্যফলের বিষয় বর্ণনা করেছিলেন। বলা হয়েছে, “কোন ব্যক্তি শতবর্ষ ব্যাপী সুমেরু পর্বত পরিমান নানাবিধ দানীয় সামগ্রী স্তূপাকারে দান করলেও একখান কঠিন চীবর দানের ষোল এ্কভাগ পুণ্যও পাওয়া যায় না।” এই একটি মাত্র উপমা থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, কঠিন চীবর দানের পুণ্যফল কত বিপুল। যাঁরা পণ্ডিত, যুক্তিবাদী, ভবিতব্য সচেতন, প্রাজ্ঞজন ও ধর্মপরায়ণ তাঁদের উচিত এই মহাণ দানোত্তম কঠিন চীবর দানের ফলের কথা ও গুণের কথা চিন্তা করে এই মহত্তর পুণ্যকর্ম সম্পাদন করা এবং সমাজের অপরাপর ধর্মানুরাগী জনগণকে উৎসাহিত করা, যাতে করে তারাও এরকম উৎকৃষ্ট দান কর্ম সম্পাদন করে ইহ এবং পরজন্মে সুখ সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে।
কঠিন চীবর দানের দ্বারা মানুষের মধ্যে ত্যাগী চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং এই দানে মানুষের সমৃদ্ধি আসে। কঠিন চীবর দান ও জাতীয় বৌদ্ধ মহাসম্মেলন আয়োজনে বৌদ্ধদের মাঝে বিরাজ করে মহামিলন, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতি। তাই মানুষের মাঝে ধর্মীয় ভাবগামীর্য জাগাতে উক্ত অনুষ্ঠান আমাদের মাঝে সুফল দান করে। প্রতিনিয়ত ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র, বিশ্বব্যাপী দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জর্জরিত, এমনি সময়ে মহামানব তথাগত বুদ্ধের অমিয়বাণী মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা মানব অন্তরের উন্মেষ সাধন করে অশান্ত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানব জীবনে লৌকিক-লোকোত্তর কল্যাণ সাধন সম্ভব। মনুষ্যলোকের মনুষ্য সম্পদ, দেবলোকের দেব সম্পদ এবং অন্তিমে পরম শান্তি নির্বাণ সুখ কঠিন চীবর দানে লাভ করা যায়। তাই প্রত্যেক বৌদ্ধ নরনারীগণ কঠিন চীবর দিবসের দিন যে সমস্ত দানীয় বস্তু‘ শ্রদ্ধার সহিত দান করেন সমস্ত দানীয় বস্ত কঠিন চীবর দানের অর্ন্তভূক্ত হবে। তাই কঠিন চীবর দানের পুণ্যফল জেনে প্রত্যেকের জীবনে একবার হলেও শ্রদ্ধার সহিত মহাফল দায়ক কঠিন চীবর দান দেওয়া উচিত। এই মহাণ কঠিন চীবর দান বিশ্ব থেরবাদী বৌদ্ধদের একটি প্রধান ধর্মীয় আচার উৎসবে পরিণত হয়েছে। যা একই মাসে বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যাণ্ড, কম্বোডিয়া, চীন, জাপান, ভুটান, লাউস, তিব্বত, ভিয়েতনাম, মঙ্গোলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধ বিহার সমূহে একেক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক কালে কঠিন চীবর দান বাঙালি বৌদ্ধদের একটি জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক ও অপরিসীম। চীবর দানোৎসব উপলক্ষে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে সমগ্র শহর-গ্রামের মানুষের মাঝে আনন্দ-উচ্ছাসের সাড়া পড়ে যায়। দানোৎসবে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সমাবেশে প্রতিটি অনুষ্ঠান যেন বৌদ্ধদের মিলন-মেলায় পরিণত হয়। এতে একদিকে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হয় অন্যদিকে ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত সভায় বিজ্ঞ ভিক্ষুসংঘ ও গৃহীদের সদ্ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাস নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা সাধারণ মানুষের জ্ঞান ভান্ডার ও নৈতিক উৎকর্ষতা সাধনে প্রভাবিত করে। দানসভা ছাড়াও সভাশেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, কীর্তন ইত্যাদি আয়োজনের মাধ্যমে কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠাটি একটি উৎসবমূখর পরিবেশে সমাপ্ত হয়ে থাকে।
[লেখক পরিচিতি: অধ্যায়নরত. ইউনিভার্সিটি অফ দ্যা ওয়েস্ট, ক্যালিফোর্নিয়া , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিএ(অনার্স), এম,এ (১ম শ্রেণীতে ১ম), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়৷ এবং পিজিডি এলআইএস ও এম.ফিল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।]
শেয়ার করুন
আরও সংবাদ দেখুন

error: Content is protected !!

কঠিন চীবর দানের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য

আপডেট সময় ০১:২২:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
দানশ্রেষ্ঠ শুভ কঠিন চীবর দানোৎসব বাঙালি বৌদ্ধ সমাজে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান। শরৎকালীন এই সময়ে বৌদ্ধদের গ্রামে গ্রামে প্রবারণা ও কঠিন চীবর দানোৎসব একটি আনন্দমূখর ধর্মীয় উৎসব ও সম্মিলন অভূতপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি করে। বাঙালি বৌদ্ধরা এই দিনটি উদযানের জন্য সারাবছর প্রতীক্ষায় থাকে। এখানে প্রত্যেকে ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান দিয়ে যেমন অসীমপুণ্য সঞ্চয় করে তেমনি দান-শীল-ভাবনাদির দেশনা শ্রবণ করেও অধিকতর প্রশান্তি লাভ করে। যা বছরে অন্যন্যা সময়ে এই সুযোগ আসেনা। ভিক্ষুদের তিনমাসের বর্ষাবাস অধিষ্ঠানের পরদিন থেকে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে কঠিন চীবর দানোৎসব উদযাপিত হয়। এতে প্রতিটি বিহারে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে উৎসবে মুখরিত হয়। তাই এই দানের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলায় কঠিন চীবর দান প্রচলনের সূত্রিতা : বঙ্গীয় অঞ্চলে বহুপূর্বে কঠিন চীবর দান প্রচলিত ছিল, কিন্ত খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় প্রভৃতি কারণে ধর্মের বিপর্যয় ঘটলে অন্যান্য ধর্মীয় আচার আচরণের মতো কঠিন চীবর দান প্রথাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। বৌদ্ধ দেশ শ্রীলঙ্কা থেকে বাঙালি বৌদ্ধদের প্রতিথযশা সাঙ্ঘিক ব্যক্তিত্ব রাজগুরু ধর্মরত্ন মহাস্থবির (রাঙ্গুনিয়া) স্বদেশে এসে সর্বপ্রথম আচার্য ভগবান চন্দ্র মহা¯’বিরকে ভিত্তি করে সৈয়দবাড়ী ধর্মচক্র বিহারে ১৯১৩ সালে দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান দিয়ে শুধু গুরু পূঁজা করেনি নতুন করে কঠিন চীবর দানের শুভ সূচনা করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাছাড়াও পটিয়া নাইখাইন সন্তোষালয় বিহারে ১৯১৪ সালে বিনায়াচার্য বংশদীপ মহাস্থবির মহোদয় আর্যশ্রাবক ভদন্ত জ্ঞানীশ্বর মহাস্থবিরকে ভিত্তি করে কঠিন চীবর দান দিয়ে আরেকটি নব ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সপ্তম সংঘরাজ সদ্ধর্মকীর্ত্তি অভয়তিষ্য মহাস্থবির ও পণ্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির কঠিন চীবর দানের ব্যাপক প্রসার ঘটান অন্যান্য গুণী-জ্ঞানী মহাস্থবিরদের সহযোগে।
বর্ষাব্রত এবং কঠিন চীবর দানের প্রবর্তন : একসময় মহাকারুণিক তথাগত সম্যকসম্বুদ্ধ দায়কগণের অভিযোগ এবং সকলের হিত-মঙ্গল কামনা পূর্বক উপলব্ধি করে বর্ষা মৌসমে ভিক্ষুরা গ্রামাঞ্চলে পদব্রজে ভ্রমণ করত: শত শত ফসলের ক্ষতি এবং বন্যপ্রাণীর ক্ষতি সাধিত হত। তখন থেকে তথাগত বুদ্ধ নিয়ম প্রবর্তনের অনুজ্ঞা প্রদান করলেন, “হে ভিক্ষুসংঘ আমি নির্দেশ প্রদান করছি বর্ষা মৌসমের তিনমাস তোমরা ভ্রমণ করবে না।” এ তিনমাস তোমরা একান্তে থেকে, একত্রে থেকে শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা অনুশীলন করবে। তখন থেকে ‘বর্ষাব্রত’ প্রথা প্রবর্তিত হয় এবং অদ্যবধি পূজনীয় ভিক্ষুসংঘ আষাঢ়ী পূর্ণিমার পরদিন থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিনমাস সুচারুরূপে বর্ষাব্রত পালনের পর মহাণ প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপনের মধ্য দিয়ে মহান ব্রত বর্ষাবাস সমাপন করেন। বর্ষাবাস সময়কালীন ভিক্ষুসংঘরা ধ্যান, ধর্মচর্চা, গবেষণা, ত্রিপিটক সাহিত্য অনুশীলন, গবেষণা ও শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ভিক্ষু জীবনকে পরিশুদ্ধ এবং সম্যক জ্ঞান উপলব্ধিতে আত্ম নিয়োগ করে থাকেন। অন্যদিকে গৃহীরাও প্রত্যেক অষ্টমী, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে অষ্টশীল পালন, ধ্যানচর্চা অনুশীলনের মধ্যদিয়ে আত্ম নিয়ন্ত্রণের সম্যক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
কথিত আছে, মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধ তাঁর পঞ্চম বর্ষা অনাথপিণ্ডিক নির্মিত শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে অবস্থান করেছিলেন। তখন পাঠেয়বাসী পশ্চিমাদেশীয় ত্রিশজন ভিক্ষু বর্ষাবাস শেষে বুদ্ধ দর্শনের জন্য শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে এসেছিলেন। বুদ্ধ সেই ত্রিশজন ভিক্ষুর পরিহিত চীবরের করুন অবস্থা দেখে অনুজ্ঞা প্রদান করেছিলেন। আজ থেকে কোন গৃহী যদি ভিক্ষু সংঘকে চীবর দান করে তবে সেই চীবর ভিক্ষু সংঘ ব্যবহার করতে পারবে। তখন থেকে ভিক্ষু সংঘ গৃহী প্রদত্ত চীবর পরিধান করা শুরু করেন।
কঠিন চীবর দান প্রচলনের পূর্বে ভিক্ষুসংঘ পাংশুকুলিক চীবর (শ্মশানে বা অন্য কোথাও পড়ে থাকা ময়লা ছিন্নবস্ত্র) পরিধান করত। এতে ভিক্ষুদের রোগাক্রান্ত হওয়া এবং স্বাস্থ্যহানি ঘটার সম্ভাবনা থাকতো প্রচুর। ভিক্ষুদের সুস্বাস্থ্য ও নীরোগ দেহের কথা চিন্তা করে রাজগৃহে বর্ষাবাসকালে তথাগত বুদ্ধ চীবর অর্থাৎ পরিস্কার বস্ত্র পরিধান করার অনুমতি দেন। তারপর থেকে সাধারণ গৃহীরা ভিক্ষুদের চীবর দান দেওয়া শুরু করেন। তবে সকল ভিক্ষুরা কঠিন চীবর গ্রহণ করতে পারে না, যারা বিনয়সম্মতভাবে ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান সমাপ্ত করেন তারাই একমাত্র কঠিন চীবর লাভ করতে পারে। তাঁদেকে কঠিন চীবর লাভী ভিক্ষু বলা হয়।
ত্রিপিটক সাহিত্যে কঠিন চীবর প্রস্তুত প্রণালী : ‘চীবর’ শব্দের অর্থ ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্র। গাছের শেকড়, গুঁড়ি, ছাল, শুকনো পাতা, ফুল ও ফলের রঙ অনুসারে এর ছয়টি রঙ নির্দিষ্ট। তবে ভিক্ষুসংঘ সাধারণত লাল ফুলের রঙের চীবরই বেশি ব্যবহার করে, যা সাধারণ গৃহীদের পরিধেয় বস্ত্র থেকে পৃথক ও বৈচিত্রহীন। কঠিন চীবর প্রস্তুত করার চার প্রকার প্রণালী। যথা : (১) যে দিন কঠিন চীবর দান করা হবে সে দিনের হতে তারপরের দিনের সূর্যোদয়ের পূর্বের মুহূর্ত পর্যন্ত এই চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই সুতা কাটা হতে আরম্ভ করে কাপড় বুনা, সেলাই করা ইত্যাদি চীবর প্রত্যেকের যাবতীয় কার্য সম্পাদন করতে হবে। (২) পরিমাণমত শ্বেত বস্ত্রে চীবর সেলাই ও রঙ করে দান দিতে হয়। (৩) পূর্বের সেলাই ও রঙ করা চীবর দ্বারা কঠিন চীবর দান দেওয়া যায়। (৪) সেলাই না করে শ্বেতবস্ত্র কঠিন চীবর দান দিতে পারে। তবে সে বস্ত্রটি চীবরে পরিণত করে পরদিন সূর্যোদয়ের পূর্বেই কঠিন চীবর করে নিতে হবে। ত্রিচীবর (সংঘাটি, অর্ন্তবাস, উত্তরাসঙ্ঘ) এ তিনের যে কোন একটি চীবর দ্বারা কঠিন চীবর দান কারা যেতে পারে। বুদ্ধ বলেছেন, জগতে প্রচলিত যত প্রকার দান আছে সর্বাপেক্ষা কঠিন চীবর দান হলো দানের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। ভিক্ষু-শ্রামণ, দায়ক-দায়িকা যে কেউ কঠিন চীবর দান দিতে পারে। কঠিন চীবর দান করতে হলে প্রথমে কমপক্ষে পাঁচজন ভিক্ষু সংঘের সম্মুখে চীবর উপস্থিত করে যথানিয়মে দান দিতে হয়। এ দানের দ্বারা শ্রেষ্ঠ সর্বপ্রকার পুণ্য লাভ হয়।
কঠিন চীবর বলার কারণ : ‘চীবর দান’ কথাটির সাথে ‘কঠিন’ শব্দটি যুক্ত হওয়ার কারণ সম্পর্কে ত্রিপিটকের অর্ন্তগত বিনয় পিটকের মহাবগ্গ গ্রন্থে’ বলা হয়েছে, “যেদিন চীবর দান করা হবে সেদিনের সূর্যোদয় থেকে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়ের অর্থাৎ ২৪ ঘন্টার মধ্যে সুতাকাটা, কাপড় বোনা, কাপড় কাটা, সেলাই ও রঙ করা, ধৌত করা ও শুকানো সহ যাবতীয় কাজগুলি সম্পন্ন করে উক্ত সময়ের মধ্যেই এ চীবর ভিক্ষুসংঘকে দান করতে হবে।” এছাড়া আরও কিছু নিয়ম-কানুন আছে, যা দাতা এবং গ্রহীতা উভয়ের জন্যই পালন করা বেশ কঠিন। কঠিন চীবর দান জন্মজন্মান্তরে সুফল প্রদান করে। প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে, যে বিহারে ভিক্ষুসংঘ বিনয়সম্মত বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান করে সে বিহারে বছরে একবার মাত্র কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এদিন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উপাসক-উপাসিকারা ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান দিয়ে থাকে। ভিক্ষুসংঘও তাদের বিনয়-বিধানের সকল নিয়ম অক্ষুন্ন রেখে পরিদেয় বস্ত্র হিসেবে এ চীবর গ্রহণ ও ব্যবহার করে।
কঠিন চীবর লাভী ভিক্ষুর পঁঞ্চ দোষ মুক্তি ও পঁঞ্চ প্রকার ফল :
(১) না বলে যেখানে সেখানে গমন করা। অর্থাৎ পূর্বাহ্নের জন্য নিমন্ত্রিত ভিক্ষু নিমন্ত্রণকর্তার গৃহ হতে সঙ্গী ভিক্ষুকে জিজ্ঞেস না করে অন্য গৃহে গমন।
(২) ত্রি চীবর বিহীন যেখানে সেখানে বিচরণ করা। অর্থাৎ অধিষ্ঠানকৃত ত্রি-চীবর রাত্রিতে নিজের হস্তপাশে বা দেড় হাতের মধ্যে রেখে সূর্যোদয় করা।
(৩) গণভোজনে গমন করা। অর্থাৎ চারজনের অনধিক ভিক্ষু নিমন্ত্রণ গ্রহন করে ভোজন করা।
(৪) ইচ্ছামত চীবর ব্যবহার করা। অর্থাৎ অতিরিক্ত চীবর যত ইছা তত অধিষ্ঠান কিংবা বেনামা করে নিজের অধিকারে রাখা।
(৫) যে স্থানে যত চীবর পাওয়া যায় সব তাদের অধিকারে রাখা। অর্থাৎ যে বিহারে যাঁরা কঠিন চীবর লাভ করেন সে বিহারে ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্যে যত চীবর প্রদত্ত হয় তৎসমুদয় তাঁদের অধিকারে থাকা। তাতে কোন আগুন্তক ভিক্ষুর অধিকার থাকে না। উল্লেখ্য, যেদিন হতে ভিক্ষু কঠিন চীবর লাভ করেন সেদিন থেকে ফাল্গুনী পূর্ণিমা পর্যন্ত উপরোক্ত পাঁচ প্রকার দোষ হতে মুক্ত থেকে পাঁচ প্রকার বিশেষ ফল লাভ করেন।
কঠিন চীবর দাতাগণের পাঁচটি বিশেষ সুফল লাভ :
(১) যেকোন জায়গায় তাঁরা বিপদমুক্ত, অন্তরায়-উপদ্রব মুক্ত হয়ে বিচরণ করতে পারে।
(২) আগুন, পানি, অসৎ রাজা, চোর এবং অকৃতজ্ঞ বা বিশ্বাসঘাতক লোকেরা তাঁদের সম্পত্তি বিনষ্ট করতে পারে না।
(৩) তাঁরা শত্রু ও অকল্যাণমিত্রদের সহিদ দেখা হয় না।
(৪) তাঁরা প্রচুর পরিমাণে ভাল কাপড় পরিধান করতে পারে এবং কখনো কাপড়ের অভাববোধ করে না।
(৫) তাঁরা স্বকীয় সম্পত্তির মালিকানা হতে বিচ্যুতি হয় না এবং তাঁদের সম্পত্তিগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়।
কঠিন চীবর দানের মাহাত্ম্য :
কঠিন চীবর দান পৃথিবীতে যত প্রকার দান আছে তাদের মধ্যো সর্বশ্রেষ্ঠ দাননুষ্ঠান। মহাকারুণিক ভগবান বুদ্ধ চৌদ্দতম বর্ষবাস যাপনকালে পাঠেয়বাসী ত্রিশজন ভিক্ষুকে উপলক্ষ্য করে দানশ্রেষ্ঠ কঠিন চীবর দানের প্রবর্তন করেছিলেন। ভগবান বুদ্ধ একসময় পঞ্চশত ষড়াভিজ্ঞ অরহত ভিক্ষুসংঘসহ আকাশপথে যেয়ে হিমালয়ের “অনোবতপ্ত” নামক মহাসরোবরে উপস্থিত হলেন। অতপর ধর্মরাজ গৌতম বুদ্ধ সহস্রদলপদ্মে উপবেশন করলেন এবং পঞ্চশত ভিক্ষুসংঘ তারাগণের ন্যায় বুদ্ধকে পরিবেষ্টন করে শতদল পদ্মে উপবেশন করলেন। এই অরহতসংঘকে সম্বোধন করে শতপুণ্য লক্ষণ তথাগত বুদ্ধ বললেন-‘হে ভিক্ষুসংঘ, তোমরা এখানে উপবিষ্ট হয়ে কঠিন চীবর দানের মাহাত্ম্য শ্রবণ করো।’ সেই শুভ মুহূর্তে বুদ্ধ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে অরহত নাগিত স্থবির দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দানের ফল বলতে আরম্ভ করলেন।
কঠিনদানং দত্বান সংঘে গুণ বরুত্তমে,
ইতো তিংসে মহাকপ্পে নাভিজানামি দুগ্গতিং।
অর্থাৎ উত্তম গুণ-শ্রেষ্ঠ সংঘ মাঝে কঠিন চীবর দান দিয়ে এ কল্প হতে বিগত ত্রিশ কল্প পর্যন্ত দুর্গতি কি অনুভব করি নাই।
কঠিন চীবর দানের মহৎ ফল বর্ণনা করতে গিয়ে সিখী বুদ্ধ বলেছেন-
যাবতা সব্বদানানি একো বস্সসতং দদে,
একস্স কঠিন দানস্স কলং নগ্ঘন্তি সোলসিং।
অর্থাৎ সর্বপ্রকার দান শতবর্ষ ব্যাপী দান করলেও, একটি কঠিনচীবর দান-পুণ্যের ষোলভাগের একভাগও পুণ্য হয়না আত্মত্যাগী পরকল্যানে ব্রতে উৎসর্গীত বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান পরিসমাপ্তিতে একমাসব্যাপী ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে দানোত্তম কঠিন চীবর দান উৎসবে যোগদান করে বুদ্ধের নির্বাণপ্রদায়ী মহাণ বাণী বহুজনের হিত, সুখ ও মঙ্গলের জন্য প্রচার করে থাকেন। এই পৃথিবীতে যতপ্রকার দান আছে যা একখানা কঠিন চীবর দানের তুলানায় ঐ দানের ফল ষোল ভাগের একভাগও হয় না। একনিষ্ট ব্রহ্মলোক পরিমাণ উচ্চ রৌপ্য পর্বত দান করলেও একখানা কঠিন চীবর দানের তুলনায় ঐ রৌপ্য পর্বত দানের ষোল ভাগের একভাগও হয় না। অতীতকালে মহাকারুনিকো শরণঙ্কর বুদ্ধের সময়ে ভগবান গৌতম বুদ্ধের অগ্রশ্রাবক “সারিপুত্র মহাথেরো” এক রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নাম ছিল “কম্বলরাজ কুমার”। যথাকালে তিনি রাজপদে অভিসিক্ত হয়েছিলেন। একদিন কম্বলরাজ কুমার বিহারে গিয়ে বুদ্ধকে বন্দনা করে বললেন- ভন্তে, এখন আমরা কোন পুণ্য কর্ম সম্পাদন করব? ব¯‘দানের মধ্যে যে দান সর্বোৎকৃষ্ট, সে দান সম্পর্কে আমাদিগকে দেশনা করুন। তখন মহাকারুনিকো শরণঙ্কর বুদ্ধ কঠিন চীবর দানের ফল বর্ণনা করে বললেন,
১. যে ব্যক্তি ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দানের জন্য বস্ত্র ক্রয় করে দেয় সে ব্যক্তি সর্বদা মনুষ্যলোকে মহাধনী, মহাযশস্বী ও মহাভোগ সম্পদশালী হয়।
২. যে ব্যক্তি সুতা তৈরী করে দেয় সে সর্বদা মনুষ্যলোকে সুখ ভোগ করে এবং সর্বদা সর্বকর্মে বিশারদ হয় ও কোন জন্মে কুজ হয়ে জন্ম লাভ করে না।
৩. সংঘকে কঠিন চীবর দানের জন্য যে ব্যক্তি বস্ত্র ছেদন করে দেয়, সে জন্মে জন্মে ধর্মত: অর্থাজনে পারদর্শী ও নিপুন হয়।
৪. যে ব্যক্তি ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর সেলাইয়ের ব্যবস্থা করে দেয় সে মনুষ্যলোকে ঐশ্বর্যশালী ও মহাপ্রভাবশালী হয়। সে মনুষ্যলোক থেকে চ্যুত হয়ে দেবলোকে উৎপন্ন হয় এবং তথায় সর্বদা দেবগণের শ্রেষ্ঠ হয় ও ঐশ্বর্যশালী দেবতা হয়ে তথায় সর্বদা সুখভোগ করে থাকেন।
৫. যে ব্যক্তি ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান দেবার জন্য কঠিন চীবর সেলাই করে সে জন্ম জন্মান্তরে সুরূপ হয়, মহাপ্রজ্ঞাবান এবং সর্বদা সুখভোগ করে। সে ভবে ভবে চর্তুদ্বীপের ঈশ্বর চক্রবর্ত্তী রাজা হয় এবং অসংখ্যবার প্রদেশের রাজত্ব প্রাপ্ত হয়। সেখান থেকে চ্যুত হয়ে দেবলোকে উৎপন্ন হয় এবং সর্বদা দিব্যসুখ ভোগ করে।
৬. যে ব্যক্তি ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান দেয়ার জন্য বস্ত্র রঞ্জন (রং) ও ধৌত কর্ম করে সে মনুষ্যলোকে উৎপন্ন হলে সর্বদা সুখী ও নিরোগী হয়। সে সুবর্ণ শরীর লাভ করে এবং সুরূপ সর্বজনের চিত্ত প্রসাদকর প্রিয়দর্শন হয়। সে দেবলোকে উৎপন্ন হলে দেবগণের প্রিয় হন।
৭. যে ব্যক্তি কঠিন চীবরের গ্রন্থী (গিরা) সুতা দান করে সে সর্বদা পরিশুদ্ধ অবস্থা সম্পন্ন হয়ে সংসরণ করে, সে জন্মে জন্মে অপায়ে উৎপন্ন হয় না।
৮. যে ব্যক্তি শ্রদ্ধার সহিত কঠিন চীবর ধৌত করে সে সুগতি প্রাপ্ত হয়। সর্বদা সে নরলোকে সুখী হয়। সে সর্বদা সগৌরবে পূজিত ও সৎকার প্রাপ্ত হয় এবং মহাযশস্বী মহাভোগসম্পদশালী ও দীর্ঘায়ু সম্পন্ন হয়। সে সর্বদা দেবলোকে দেববৃন্দের এবং মনুষ্যলোকে মনুষ্যদের শ্রেষ্ঠ হয়। এভাবে বুদ্ধ কঠিন চীবর দানর ফল ব্যাখ্যা করেন।
পালি সাহিত্যে উল্লেখ আছে, তথাগত বুদ্ধ কঠিন চীবর দানের ফল বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে পাঁচশ জন অরহত ভিক্ষুসহ হিমালয়ের অনোবতপ্ত নামক মহাসরোবরে উপনীত হয়েছিলেন। সেখানে বুদ্ধ সহসদল পদ্মে এবং ভিক্ষুগণ শতদল পদ্মে উপবেশন করলে প্রথমে নাগিত স্থবির এবং পরে স্বয়ং তথাগত বুদ্ধ কঠিন চীবর দানের অক্ষয় অপরিমেয় পুণ্যফলের বিষয় বর্ণনা করেছিলেন। বলা হয়েছে, “কোন ব্যক্তি শতবর্ষ ব্যাপী সুমেরু পর্বত পরিমান নানাবিধ দানীয় সামগ্রী স্তূপাকারে দান করলেও একখান কঠিন চীবর দানের ষোল এ্কভাগ পুণ্যও পাওয়া যায় না।” এই একটি মাত্র উপমা থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, কঠিন চীবর দানের পুণ্যফল কত বিপুল। যাঁরা পণ্ডিত, যুক্তিবাদী, ভবিতব্য সচেতন, প্রাজ্ঞজন ও ধর্মপরায়ণ তাঁদের উচিত এই মহাণ দানোত্তম কঠিন চীবর দানের ফলের কথা ও গুণের কথা চিন্তা করে এই মহত্তর পুণ্যকর্ম সম্পাদন করা এবং সমাজের অপরাপর ধর্মানুরাগী জনগণকে উৎসাহিত করা, যাতে করে তারাও এরকম উৎকৃষ্ট দান কর্ম সম্পাদন করে ইহ এবং পরজন্মে সুখ সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে।
কঠিন চীবর দানের দ্বারা মানুষের মধ্যে ত্যাগী চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং এই দানে মানুষের সমৃদ্ধি আসে। কঠিন চীবর দান ও জাতীয় বৌদ্ধ মহাসম্মেলন আয়োজনে বৌদ্ধদের মাঝে বিরাজ করে মহামিলন, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতি। তাই মানুষের মাঝে ধর্মীয় ভাবগামীর্য জাগাতে উক্ত অনুষ্ঠান আমাদের মাঝে সুফল দান করে। প্রতিনিয়ত ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র, বিশ্বব্যাপী দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জর্জরিত, এমনি সময়ে মহামানব তথাগত বুদ্ধের অমিয়বাণী মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা মানব অন্তরের উন্মেষ সাধন করে অশান্ত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানব জীবনে লৌকিক-লোকোত্তর কল্যাণ সাধন সম্ভব। মনুষ্যলোকের মনুষ্য সম্পদ, দেবলোকের দেব সম্পদ এবং অন্তিমে পরম শান্তি নির্বাণ সুখ কঠিন চীবর দানে লাভ করা যায়। তাই প্রত্যেক বৌদ্ধ নরনারীগণ কঠিন চীবর দিবসের দিন যে সমস্ত দানীয় বস্তু‘ শ্রদ্ধার সহিত দান করেন সমস্ত দানীয় বস্ত কঠিন চীবর দানের অর্ন্তভূক্ত হবে। তাই কঠিন চীবর দানের পুণ্যফল জেনে প্রত্যেকের জীবনে একবার হলেও শ্রদ্ধার সহিত মহাফল দায়ক কঠিন চীবর দান দেওয়া উচিত। এই মহাণ কঠিন চীবর দান বিশ্ব থেরবাদী বৌদ্ধদের একটি প্রধান ধর্মীয় আচার উৎসবে পরিণত হয়েছে। যা একই মাসে বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যাণ্ড, কম্বোডিয়া, চীন, জাপান, ভুটান, লাউস, তিব্বত, ভিয়েতনাম, মঙ্গোলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধ বিহার সমূহে একেক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক কালে কঠিন চীবর দান বাঙালি বৌদ্ধদের একটি জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক ও অপরিসীম। চীবর দানোৎসব উপলক্ষে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে সমগ্র শহর-গ্রামের মানুষের মাঝে আনন্দ-উচ্ছাসের সাড়া পড়ে যায়। দানোৎসবে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সমাবেশে প্রতিটি অনুষ্ঠান যেন বৌদ্ধদের মিলন-মেলায় পরিণত হয়। এতে একদিকে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হয় অন্যদিকে ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত সভায় বিজ্ঞ ভিক্ষুসংঘ ও গৃহীদের সদ্ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাস নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা সাধারণ মানুষের জ্ঞান ভান্ডার ও নৈতিক উৎকর্ষতা সাধনে প্রভাবিত করে। দানসভা ছাড়াও সভাশেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, কীর্তন ইত্যাদি আয়োজনের মাধ্যমে কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠাটি একটি উৎসবমূখর পরিবেশে সমাপ্ত হয়ে থাকে।
[লেখক পরিচিতি: অধ্যায়নরত. ইউনিভার্সিটি অফ দ্যা ওয়েস্ট, ক্যালিফোর্নিয়া , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিএ(অনার্স), এম,এ (১ম শ্রেণীতে ১ম), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়৷ এবং পিজিডি এলআইএস ও এম.ফিল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।]