০৪:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ভাষাসৈনিক প্রতিভা মুৎসুদ্দি

  • আফরিন শাহনাজ
  • আপডেট সময় ০৪:৩১:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ মার্চ ২০২৩
  • ৫৭৪ বার পড়া হয়েছে

প্রতিভা মুৎসুদ্দি শিক্ষাবিদ ও ভাষাসংগ্রামী। জন্ম ১৯৩৫ সালে ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার মহামুনী পাহাড়তলী গ্রামে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, দেশভাগ, ভাষার দাবিতে আন্দোলিত সময়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি। তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি গ্রামের স্কুলে। কলেজ জীবনে ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে বাম রাজনীতিতে আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছেন।

১৯৪৭ সালে প্রতিভা মুৎসুদ্দি চট্টগ্রামের রাউজানে ছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল ভাষা আন্দোলন, ‘সেই কিশোর বয়সে একটি গ্রামের স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী, রাজনীতির কিছুই বুঝি না, কিন্তু তখনই স্কুলের বড়ো ভাইদের কাছে শুনলাম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ৫৬ শতাংশ ভাষা বাংলাভাষাকে বাদ দিয়ে ৪৪ শতাংশ মানুষের ভাষা উর্দুভাষাকে চাপিয়ে দেয়া হবে। কিশোর মন চঞ্চল হয়ে উঠলো। আমাদের স্কুলের (মহামুনি অ্যাংলো গলি ইনস্টিটিউশন) দশম শ্রেণির ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেবপ্রিয় বড়ুয়ার নেতৃত্বে ছাত্র ফেডারেশন গঠন করল। দশম শ্রেণির ছাত্র সুনীল আইচ ছাত্রীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব দিলো আমার ওপর।

… আমার বাবা এ খবর পেয়ে আমাকে ও আমার ছোট বোন মীরাকে গ্রাম থেকে স্থানান্তরিত করে চট্টগ্রাম শহরে ডা. খাস্তগীর গার্লস হাই স্কুলে ভর্তি করলেন। নবম-দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা সম্ভব হলো না। ১৯৫১ সালে চট্টগ্রাম কলেজে আই.এ. ক্লাসে ভর্তি হই। তখন থেকে শুরু হয় অধিকার আদায়ের প্রস্তুতি। পূর্ণেন্দু দস্তিদার, দেবেন্দ্র শিকদার, মীরাদি, প্রতিদি, শেলীদি এঁদের কাছে পাঠ নিয়ে কলেজের ছাত্রীদের সংঘবদ্ধ করি। ভাষার অধিকার আদায় তখন প্রধান আন্দোলনের বিষয়।’

১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজের আই.এ. ২য় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়া প্রসঙ্গে প্রতিভা মুৎসুদ্দি এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ মো. আলী জিন্নাহর এ অন্যায় ঘোষণার প্রতিবাদে পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা রোষে ফেটে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম কমিটি গঠন করে। চট্টগ্রামেও মাহবুব উল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম কমিটি গড়ে ওঠে। ভাষার দাবিতে মাহবুব উল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেই।

অন্যান্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে মিছিল, সভা, স্লোগান করি। বাবা কখনোই চাইতেন না মেয়ে রাজনীতিতে জড়াক। অভিভাবকদের বাধা উপেক্ষা করে মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে নেমে মিছিল, সভা, স্লোগানে অংশ নেই। চট্টগ্রাম রাষ্ট্রভাষা কমিটির আহ্বায়ক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর আহ্বানে ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমি ধর্মঘট পালন, মিছিল ও সভায় যোগ দিই। ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের জন্য আগের দিন সারা রাত জেগে সবাই পোস্টার লেখে। আমি পোস্টার লিখতে পারতাম না। অন্যরা যেগুলো লিখত তা দেয়ালে দেয়ালে লাগাতাম। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বিকালে শিক্ষার্থীদের এক বিরাট মিছিল নিয়ে ডা. খাস্তগীর স্কুলে যাই। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে ঢাকার ছাত্রদের ওপর পুলিশি জুলুমের কথা এবং ছাত্র হত্যার কথা মেয়েদের অবগত করি। সেখান থেকে ট্রাকযোগে মেয়েদের মিছিল নিয়ে চট্টগ্রামের সারা শহর প্রদক্ষিণ করি। আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় বিভিন্ন নারী সংগঠন। চট্টগ্রামের সর্বদলীয় কর্মপরিষদের হয়ে সেদিন রাজপথে নামেন শেলী দস্তিদার, প্রণতি দস্তিদার (পূর্ণেন্দু দস্তিদারের বোন), মীরাসহ সিনিয়র শিক্ষার্থী সুলেখা, মিনতি, রামেন্দ্র, সুচরিত চৌধুরীসহ আরও অনেকে।

২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। শহরের সমস্ত দোকানপাট, যানবাহন সরকারি অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। চট্টগ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতালে অংশগ্রহণ করে। এ আন্দোলনে মেয়েরাও সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। তখন মেয়েদের রাস্তায় বের হয়ে মিছিল করা ছিল অকল্পনীয়। তা সত্ত্বেও মেয়েরা নিজ উদ্যোগে মিছিলে অংশগ্রহণ করে।’

প্রতিভা মুৎসুদ্দি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময়ও প্রচুর সাংগঠনিক কাজ করছেন। সেসময়ে চট্টগ্রাম শহরে ছাত্রী ও নারীদের একত্র করা, মিটিং, শোভাযাত্রায় তাদের অংশগ্রহণের মতো অসম্ভব কাজগুলো সম্ভব করেছেন। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৫ সালের স্বাধিকার আন্দোলনের এক মিছিল থেকে তিনি গ্রেফতার হন। দু সপ্তাহের কারাবাসের পর মুক্তি পান।

তিনি নারী শিক্ষা প্রসারের পথিকৃৎ। প্রতিভা মুৎসুদ্দি ১৯৬৩ সালে ভারতেশ্বরী হোমসে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষিকা হিসাবে কাজে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৮ সালে অবসর নেন। তিনি রণদা প্রসাদ সাহা প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বাংলাদেশ) লিঃ এর পরিচালক। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০০২ সালে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

শেয়ার করুন
আরও সংবাদ দেখুন

ভাষাসৈনিক প্রতিভা মুৎসুদ্দি

আপডেট সময় ০৪:৩১:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ মার্চ ২০২৩

প্রতিভা মুৎসুদ্দি শিক্ষাবিদ ও ভাষাসংগ্রামী। জন্ম ১৯৩৫ সালে ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার মহামুনী পাহাড়তলী গ্রামে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, দেশভাগ, ভাষার দাবিতে আন্দোলিত সময়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি। তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি গ্রামের স্কুলে। কলেজ জীবনে ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে বাম রাজনীতিতে আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছেন।

১৯৪৭ সালে প্রতিভা মুৎসুদ্দি চট্টগ্রামের রাউজানে ছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল ভাষা আন্দোলন, ‘সেই কিশোর বয়সে একটি গ্রামের স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী, রাজনীতির কিছুই বুঝি না, কিন্তু তখনই স্কুলের বড়ো ভাইদের কাছে শুনলাম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ৫৬ শতাংশ ভাষা বাংলাভাষাকে বাদ দিয়ে ৪৪ শতাংশ মানুষের ভাষা উর্দুভাষাকে চাপিয়ে দেয়া হবে। কিশোর মন চঞ্চল হয়ে উঠলো। আমাদের স্কুলের (মহামুনি অ্যাংলো গলি ইনস্টিটিউশন) দশম শ্রেণির ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেবপ্রিয় বড়ুয়ার নেতৃত্বে ছাত্র ফেডারেশন গঠন করল। দশম শ্রেণির ছাত্র সুনীল আইচ ছাত্রীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব দিলো আমার ওপর।

… আমার বাবা এ খবর পেয়ে আমাকে ও আমার ছোট বোন মীরাকে গ্রাম থেকে স্থানান্তরিত করে চট্টগ্রাম শহরে ডা. খাস্তগীর গার্লস হাই স্কুলে ভর্তি করলেন। নবম-দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা সম্ভব হলো না। ১৯৫১ সালে চট্টগ্রাম কলেজে আই.এ. ক্লাসে ভর্তি হই। তখন থেকে শুরু হয় অধিকার আদায়ের প্রস্তুতি। পূর্ণেন্দু দস্তিদার, দেবেন্দ্র শিকদার, মীরাদি, প্রতিদি, শেলীদি এঁদের কাছে পাঠ নিয়ে কলেজের ছাত্রীদের সংঘবদ্ধ করি। ভাষার অধিকার আদায় তখন প্রধান আন্দোলনের বিষয়।’

১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজের আই.এ. ২য় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়া প্রসঙ্গে প্রতিভা মুৎসুদ্দি এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ মো. আলী জিন্নাহর এ অন্যায় ঘোষণার প্রতিবাদে পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা রোষে ফেটে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম কমিটি গঠন করে। চট্টগ্রামেও মাহবুব উল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম কমিটি গড়ে ওঠে। ভাষার দাবিতে মাহবুব উল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেই।

অন্যান্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে মিছিল, সভা, স্লোগান করি। বাবা কখনোই চাইতেন না মেয়ে রাজনীতিতে জড়াক। অভিভাবকদের বাধা উপেক্ষা করে মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে নেমে মিছিল, সভা, স্লোগানে অংশ নেই। চট্টগ্রাম রাষ্ট্রভাষা কমিটির আহ্বায়ক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর আহ্বানে ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমি ধর্মঘট পালন, মিছিল ও সভায় যোগ দিই। ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের জন্য আগের দিন সারা রাত জেগে সবাই পোস্টার লেখে। আমি পোস্টার লিখতে পারতাম না। অন্যরা যেগুলো লিখত তা দেয়ালে দেয়ালে লাগাতাম। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বিকালে শিক্ষার্থীদের এক বিরাট মিছিল নিয়ে ডা. খাস্তগীর স্কুলে যাই। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে ঢাকার ছাত্রদের ওপর পুলিশি জুলুমের কথা এবং ছাত্র হত্যার কথা মেয়েদের অবগত করি। সেখান থেকে ট্রাকযোগে মেয়েদের মিছিল নিয়ে চট্টগ্রামের সারা শহর প্রদক্ষিণ করি। আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় বিভিন্ন নারী সংগঠন। চট্টগ্রামের সর্বদলীয় কর্মপরিষদের হয়ে সেদিন রাজপথে নামেন শেলী দস্তিদার, প্রণতি দস্তিদার (পূর্ণেন্দু দস্তিদারের বোন), মীরাসহ সিনিয়র শিক্ষার্থী সুলেখা, মিনতি, রামেন্দ্র, সুচরিত চৌধুরীসহ আরও অনেকে।

২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। শহরের সমস্ত দোকানপাট, যানবাহন সরকারি অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। চট্টগ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতালে অংশগ্রহণ করে। এ আন্দোলনে মেয়েরাও সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। তখন মেয়েদের রাস্তায় বের হয়ে মিছিল করা ছিল অকল্পনীয়। তা সত্ত্বেও মেয়েরা নিজ উদ্যোগে মিছিলে অংশগ্রহণ করে।’

প্রতিভা মুৎসুদ্দি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময়ও প্রচুর সাংগঠনিক কাজ করছেন। সেসময়ে চট্টগ্রাম শহরে ছাত্রী ও নারীদের একত্র করা, মিটিং, শোভাযাত্রায় তাদের অংশগ্রহণের মতো অসম্ভব কাজগুলো সম্ভব করেছেন। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৫ সালের স্বাধিকার আন্দোলনের এক মিছিল থেকে তিনি গ্রেফতার হন। দু সপ্তাহের কারাবাসের পর মুক্তি পান।

তিনি নারী শিক্ষা প্রসারের পথিকৃৎ। প্রতিভা মুৎসুদ্দি ১৯৬৩ সালে ভারতেশ্বরী হোমসে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষিকা হিসাবে কাজে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৮ সালে অবসর নেন। তিনি রণদা প্রসাদ সাহা প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বাংলাদেশ) লিঃ এর পরিচালক। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০০২ সালে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।