০৭:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

থের-মহাথের বা স্থবির মহাস্থবির বলতে যাদের বুঝায়!

  • নিপুন বড়ুয়া
  • আপডেট সময় ০৪:২০:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ জুলাই ২০২৩
  • ১৫০৩ বার পড়া হয়েছে

কথামুখ: থের ও মহাথের হলো পালি শব্দ আর স্থবির ও মহাস্থবির হলো সংস্কৃত শব্দ। উভয় শব্দযুগল পালিতে যেই অর্থ প্রকাশ করে সংস্কৃতেও একই অর্থ প্রকাশ করে, এমনকি সংস্কৃত শব্দ স্থবির ও মহাস্থবির বাংলাতেও একই নাম ও অর্থবাচক। থের শব্দটি সম্ভবত ‘ঠিত’ শব্দ হতে উৎপন্ন হয়ে ‘থির’ এ পরিবর্তন হয়ে ‘থের’ হয়েছে। ‘ঠিত’ অর্থ দাঁড়ানো, অনঢ়, অবিচল; আর ‘থির’ অর্থ হলো হলো সুকঠিন, সুদৃঢ়, দীর্ঘস্থায়ী। স্থবির শব্দ ‘স্থিত’ শব্দ হতে এসেছে। ঠিত ও স্থিত একই অর্থবোধক। পালি শব্দ ঠিত বা সংস্কৃত শব্দ স্থিত’কে বাংলায় ‘স্থিত’ই বলে। পালি ‘থের’র মূল অর্থ যেমন স্থির; তেমনি সংস্কৃত ‘স্থবির’ অর্থও হলো স্থির; এবং থের ও স্থবির শব্দের পূর্বে ‘মহা’ বিশেষণ যুক্ত হয়ে মহাথের বা মহাস্থবির রূপ পরিগ্রহ করেছে। সুতরাং থের ও স্থবির= স্থির; মহাথের বা মহাস্থবির= মহাস্থবির।

বুদ্ধের সমকালীন বুদ্ধের সরাসরি শিষ্য-প্রশিষ্যগণকে ‘থের’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। কেননা, তারা স্থির। কোন অর্থে স্থির? মানসিক-বাচনিক-কায়িক সুকর্ম সম্পাদনকারী অর্থে স্থির; তৃষ্ণার নিরবশেষ সমূলে বিধ্বংস করে নৈর্বাণিক সুখ অধিগত করার অর্থে স্থির; পাপে ভয় ও লজ্জাশীল অর্থে স্থির; ন্যায়নিষ্ঠতা ও মৈত্রী-করুণা-মুদিতা-উপেক্ষার আচরণশীলতায় স্থির; বুদ্ধের শিক্ষা অনুসারে চতুরার্য সত্যে প্রতিষ্ঠিত অর্থে স্থির; আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ প্রতিপালন ও সম্পাদনকারীতায় স্থির। উপরোক্ত অর্থে স্থিরতা বা মহা-স্থিরতায় যারা সুপ্রতিষ্ঠিত তারাই প্রকৃত অর্থে বুদ্ধবাণি অনুযায়ী থের বা মহাথের অভিধার পূর্ণাঙ্গ উপযুক্ত পাত্র।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণে থের শব্দের অর্থ কিন্তু প্রাচীন, জ্যেষ্ঠ, অগ্রজ, পূর্বজ, আদি প্রভৃতি। বিশেষভাবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণের থের বা স্থবির শব্দের অর্থের সাথে বিনয়গত বা গুণগত থের’কে হুবহু এক মনে করার কারণ নেই।

থের – মহাথের’র প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য:

উপরোক্ত প্রাচীন, অগ্রজ, আদর্শ-নৈতিকতা প্রভৃতির বিচারে গবেষক-পণ্ডিতগণ তিন প্রকারের মহাথেরর কথা উক্ত করেছেন।

যথা—
(১). জাতি মহাথের: জন্মগত বয়স বা বার্ধক্য হেতু যারা মহাথের/মহাস্থবির পদবাচ্য।
(২). সম্মুতি (সম্মতি) মহাথের: উপসম্পদার বয়স ভিত্তিতে দশ বছর অতিক্রান্ত হলে বলা হয় থের, এবং উপসম্পদার বয়স ভিত্তিতে কুড়ি বছর অতিক্রান্ত হলে মহাথের বলা হয়। অর্থাৎ, কোনও ব্যক্তি উপসম্পদা বা ভিক্ষু জীবন গ্রহণ করে এক নাগাড়ে দশ বছর ভিক্ষু জীবন অতিবাহিত করলে তাকে বলা হয় থের এবং কুড়ি বছর অতিবাহিত করলে তাকে বলা হয় মহাথের। সচরাচর ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত থের-মহাথের বরণোৎসব বা অভিধা প্রদান উৎসবগুলো ‘সম্মুতি’ কেন্দ্রিক। এখানে সম্মুতি বলতে সীমাঘরে সাঙ্ঘিক বিনয়কর্ম করে সঙ্ঘের সম্মতিতে ‘থের’ বা ‘মহাথের’ অভিধা প্রদান করাই হলো সম্মুতি মহাথের।
(৩). ধর্ম (ধম্ম) মহাথের: ধর্ম মহাথের বলতে পূর্বোক্ত আদর্শ-নৈতিকতা ভিত্তিক। আদর্শ ও নৈতিকতা ভিত্তিক ‘থের’ই যেহেতু প্রধানতম থের সেহেতু সেই বিষয়ে বুদ্ধের মূলোপদেশ হতে কিছু কথকতা এই নিবন্ধটি বিশেষভাবে দাবি রাখেই বৈ কি।

শুধুমাত্র ওয়া বা বর্ষাবাসের বাড়লেই কী থের মহাথের হওয়া যায়? :অঙ্গুত্তর নিকায়ের চতুর্থ নিপাতের প্রথম পঞ্চাশকের অধিভূক্ত উরুবেলা বর্গের দ্বিতীয় সূত্র এ বুদ্ধ স্থবিরকরণ বা থেরকরণ ধর্ম চার প্রকার বলে বলেছেন। এ বিষয়ে বক্ষ্যমাণ উরুবেলা বর্গে ব্যক্ত হয়েছে— বুদ্ধ যখন বুদ্ধত্ব লাভের পর নৈরঞ্জনা নদী তীরের অজপাল ন্যাগ্রোধ বৃক্ষমূলে অবস্থান করছেন, তখন কিছু বৃদ্ধ-মধ্য-প্রাপ্ত বয়স্ক, জ্ঞানী ও সম্মানিত ব্রাহ্মণ বুদ্ধের নিকট এসে বুদ্ধকে অনুযোগ করলেন যে, বুদ্ধ বৃদ্ধ-মধ্য-প্রাপ্ত বয়স্ক, জ্ঞানী ও সম্মানিত ব্রাহ্মণদের সম্মান-অভিবাদন-শ্রদ্ধা করেন না। এই অনুযোগের উত্তরে বুদ্ধের অভিব্যক্তি ছিলো: “যদি আশি, নব্বই কিংবা শতবর্ষী বৃদ্ধ জন্ম দ্বারা বৃদ্ধ হয় এবং তারা যদি অকালবাদী, অভূতবাদী, অনর্থবাদী, অধর্মবাদী, অবিনয়বাদী ও অকালে অর্থ, কারণ ও বিবেচনাহীন, অনর্থপূর্ণবাক্য ভাষণকারী হয় তবে তারা তো ‘মূর্খ স্থবির’ নামেই অভিহিত হবার যোগ্য। আবার যদি কোন অল্পবয়স্ক যুবক কালো কেশধারী, ভদ্রযৌবনে সমন্বিত এবং প্রথম বয়স হতেই কালবাদী, ভূতবাদী, অর্থবাদী, ধর্মবাদী, বিনয়বাদী ও যথাকালে অর্থ সমন্বিত কারণ সমন্বিত ও বিবেচনাযুক্ত, অর্থপূর্ণবাক্য ভাষণকারী হয় তাহলে তারাই তো ‘পণ্ডিত স্থবির’ সংজ্ঞায় অন্তর্ভূক্ত। তদ্বেতু তিনি অভিমত প্রকাশ করেছিলেন— স্থবিরকরণ ধর্ম চার প্রকার। যথা:

(১). যেই ভিক্ষু শীলবান, প্রাতিমোক্ষ সংবরসংযুক্ত, আচার-গোচরসম্পন্ন, বিন্দুমাত্র পাপ করতেও ভয় পায়, শিক্ষাপদ সমূহ গ্রহণ করে ও শিক্ষা করে তিনিই যথার্থ ‘স্থবির’।
(২). যিনি শ্রুতিধর, শ্রুতিসঞ্চয়ী ও বহুশ্রুত তিনিই যথার্থ ‘স্থবির’।
(৩). যিনি আদি-মধ্য-অন্ত (শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা) কল্যাণময়, অর্থ সমন্বিত পরিপূর্ণ ব্রহ্মচর্য ধর্মসমূহ দ্বারা বহুশ্রুত, তৃপ্ত, অভিজ্ঞ, উপলব্ধিপ্রবণ ও প্রাজ্ঞ হয় তিনিই যথার্থ ‘স্থবির’।
(৪). যিনি প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয়-চতুর্থ ধ্যানলাভী হন, যিনি স্বীয় অভিজ্ঞতায় সদ্ধর্ম উপলব্ধি করেন, যিনি আসব ক্ষয় করে অনাসক্ত হয়ে চিত্ত বিমুক্তি ও প্রজ্ঞা বিমুক্তি লাভ করে বাস করেন তিনিই যথার্থ ‘স্থবির’।

খুদ্দক নিকায় অন্তর্গত ‘ধর্মপদ’-এর ধার্মিক বর্গের ৫ ও ৬ নং (ধর্মপদের ক্রমানুসারে ২৬০-২৬১ নং গাথা) গাথায়ও উদ্ধৃত হয়েছে— মাথার চুল পাকলে কেউ স্থবির হয় না, তার বয়স পরিপক্বতা ও বার্ধক্য নিরর্থক। যাঁর মধ্যে চারি আর্যসত্য, নবলোকুত্তর ধর্ম, অহিংসা, সংযম ও ইন্দ্রিয় সংবরণ বিদ্যমান, যিনি নির্মল চরিত্র ও জ্ঞানবান তিনিই ‘স্থবির’ অভিধার উপযুক্ত।

অযোগ্য ও যোগ্য থের-মহাথের :

অঙ্গুত্তর নিকায়ের পঞ্চক নিপাতের স্থবির (থের) বর্গের অন্তর্গত সূত্রে উল্লেখ হয়েছে— যে সকল স্থবির ভিক্ষুগণ প্রলোভনের দ্বারা প্রলুব্ধ, দূষণের দ্বারা দূষিত, সম্মোহনের মাধ্যমে মোহাচ্ছন্ন, ক্রোধের মাধ্যমে বিক্ষুব্ধ, উন্মত্ততার মাধ্যমে প্রমত্ত; রাগ-দ্বেষ-মোহ সম্বলিত, পরের গুণবিনাশী, বিদ্বেষ পরায়ণ; প্রতারক, ভাগ্য গণনাকারী, যেখানে যেই বাক্য ভাষণ করলে লাভ হবে সেখানে সেই বাক্য ভাষণ করে (লাভ-সৎকারের জন্য চাটুকারী করেন), ফাঁকিবাজ, লাভের দ্বারা লাভ অন্বেষী; অশ্রদ্ধাবান, পাপের প্রতি ভয় ও লজ্জাহীন, অলস ও মূর্খ; রূপ-শব্দ-গন্ধ-রস ও স্পর্শের প্রতি ঈর্ষাকাতর-অসহনশীল— এই সকল অভ্যাসকারী-চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন স্থবির ভিক্ষুগণ সব্রহ্মচারীগণের নিকট অপ্রিয়, অমনোজ্ঞ, গৌরবহীন ও শ্রদ্ধার অযোগ্য হয়।

অন্যদিকে যে সকল স্থবির ভিক্ষুগণ প্রলোভনের দ্বারা প্রলুব্ধ নন, দূষণের দ্বারা দূষিত নন, সম্মোহনের মাধ্যমে মোহাচ্ছন্ন নন, ক্রোধের মাধ্যমে বিক্ষুব্ধ নন, উন্মত্ততার মাধ্যমে প্রমত্ত নন; বীতরাগ, বীতদ্বেষ, বীতমোহ, পরের গুণ বিনাশ করে না-পরচর্চা করে পরের গুণকে ধ্বংস করে না; প্রতারক হন না, ভাগ্য গণনাকারী হন না, যেখানে যেই বাক্য ভাষণ করলে লাভ হবে সেখানে সেই বাক্য ভাষণ করেন না (লাভ-সৎকারের জন্য চাটুকারী করেন না), ফাঁকিবাজ নন, লাভের দ্বারা লাভ অন্বেষীও নন; শ্রদ্ধাপরায়ণ, পাপের প্রতি ভয় ও লজ্জা সম্পন্ন, বীর্যবান ও প্রজ্ঞাবান; রূপের প্রতি ধৈর্যশীল, শব্দের প্রতি ধৈর্যশীল, রসের প্রতি ধৈর্যশীল ও স্পর্শের প্রতি ধৈর্যশীল সেই সকল স্থবির ভিক্ষুগণ সব্রহ্মচারীগণের নিকট প্রিয়, মনোজ্ঞ, গৌরবনীয় ও শ্রদ্ধার উপযুক্ত।আবার এও ব্যক্ত হয়েছে যে— অর্থ, ধম্ম, নিরুক্তি ও প্রতিভান— এই চার প্রকার প্রতিসম্ভিদা প্রাপ্ত স্থবির, সব্রহ্মচারীদের ছোট-বড় কাজে যিনি সুদক্ষ ও কর্মঠ এবং পরিশ্রমী; উপায়কুশলী ও অপরকে উপায়কুশলী হতে সহায়তাকারী সেই সকল স্থবিরগণ সব্রহ্মচারীগণের নিকট প্রিয়, মনোজ্ঞ, গৌরবনীয় ও শ্রদ্ধার উপযুক্ত। যেই স্থবির ভিক্ষুগণ প্রাতিমোক্ষ (ভিক্ষু বিনয়) সংবরে সংযত, আচার ও গোচর সম্পন্ন অর্থাৎ আচরণ-ইন্দ্রিয়-খাদ্যদ্রব্য-বাসস্থান প্রভৃতির প্রতি যথাযথ ভূমিকায় নিয়ে সুশৃঙ্খলতায় সুসমৃদ্ধ, বিন্দুমাত্র নিন্দনীয় আচরণেও ভয়দর্শী, বিনয়ানুগ শিক্ষাপদ সমূহ আয়ত্ত করে সচ্চরিত্র ও সুচরিত্রবান হবার প্রয়াসী; যিনি বহুশ্রুত, শ্রুতিধর, শ্রুতি সঞ্চয়ী; যিনি আদি কল্যাণ শীলে-মধ্য কল্যাণ সমাধিতে-অন্তে কল্যাণ প্রজ্ঞায় শ্রুতিবান-ধৃতিমান হয়; উক্ত আদি-মধ্য-অন্ত কল্যাণপ্রসূ শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার বিষয় যাঁর কণ্ঠস্থ ও মনের দ্বারা প্রত্যক্ষ বা উপলব্ধিকৃত; যিনি কল্যাণভাষী ও আন্তরিকভাষী, বাচনিক শিষ্টতায়, স্পষ্ট উচ্চারণে, পরিষ্কার কণ্ঠে এবং অর্থব্যাখ্যায় সুদক্ষ, ধ্যানলাভী, চিত্ত বিমুক্তি ও প্রজ্ঞাবিমুক্তি লাভী তিনি সব্রহ্মচারীগণের নিকট প্রিয়, মনোজ্ঞ, গৌরবনীয় ও শ্রদ্ধার উপযুক্ত।অঙ্গুত্তর নিকায়ের পঞ্চক নিপাতের স্থবির বর্গের আট নং সূত্র ‘স্থবির সূত্র’-এ কিভাবে একজন স্থবির ভিক্ষু কিভাবে অনেকের সুখ-দুঃখ, কল্যাণ-অকল্যাণের কারণ হয় তদ্বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একজন স্থবির ভিক্ষু কিভাবে অনেকের দুঃখ ও অকল্যাণের কারণ হয় সে বিষয়েও বলা হয়েছে— একজন স্থবির ভিক্ষু, যিনি দীর্ঘদিন-রাত্রি যাবত প্রব্রজ্যিত থাকেন, সুপরিচিত ও যশস্বী হন, অনেক গৃহি ও প্রব্রজ্যিত তার অনুগামী-অনুসারী হন; বুদ্ধের শিক্ষা তিনি কণ্ঠস্থ করেন, শীল-সমাধি-প্রজ্ঞায় যিনি শিক্ষিত হন কিন্তু যথাযথভাবে তিনি সেই শিক্ষাকে উপলব্ধি বা হৃদয়ঙ্গম করতে না পেরে তিনি ভ্রান্তভাবে, মিথ্যাদৃষ্টিগতভাবে ধর্ম শিক্ষা দেন, সদ্ধর্ম হতে বিচ্যুত করে লোকেদেরকে অসদ্ধর্মে প্রতিষ্ঠিত করান। বহুদিন ধরে বুদ্ধ বস্ত্র ধারণ করার দরুণ, লোকেদের দ্বারা বিবিধপ্রকারে সম্মান সৎকার লাভ করার দরুণ বহু লোক, বহু প্রব্রজ্যিত তাকে অনুসরণ করেন এবং তাঁর উপদেশ শ্রবণ করেন। সেই রকম স্থবির ভিক্ষুর যারা অনুসারী তারা তাঁর মিথ্যাদৃষ্টিকে গ্রহণ করে নিজেদের জন্য দুঃখ উৎপন্ন করেন ও অকল্যাণকে আহ্বান করেন।পরিশেষ: মধ্যম নিকায়ের ২২ তম সূত্র ‘অলগর্দোপম সূত্র’-এ এই প্রকৃতির বিষয়কে অভিজ্ঞ সাপুড়িয়া দ্বারা ব্যর্থভাবে বিষধর সাপ ধরার মতোন তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি বুদ্ধের উপদেশাদি যথাযথভাবে প্রজ্ঞাদ্বারা পরীক্ষা-উপ-পরীক্ষা-অনুপরীক্ষা না করে আচরণ-অনুসরণ-অনুশীলন করে তবে সেই ব্যক্তি বুুদ্ধের শিক্ষায় অভিজ্ঞ হলেও প্রজ্ঞাদ্বারা পরীক্ষা-উপ-পরীক্ষা-অনুপরীক্ষা না করার দরুণ তিনি যথাযথভাবে সদ্ধর্ম উপলব্ধি না করে আচরণ করতে যান এবং তা তার দুঃখের কারণ হয়; যেমন সাপুড়িয়া অভিজ্ঞ হলেও সাপের যথাস্থানে, উপযুক্তভাবে ধরতে না পারার দরুণ সর্প দংশনে সাপুড়িয়ার দুঃখ উৎপন্ন হয়।

অপরপক্ষে স্থবির ভিক্ষু যদি দীর্ঘদিন-রাত্রি যাবত প্রব্রজ্যিত থাকেন, সুপরিচিত ও যশস্বী হন, অনেক গৃহি ও প্রব্রজ্যিত তার অনুগামী-অনুসারী হন; বুদ্ধের শিক্ষা তিনি কণ্ঠস্থ করেন, শীল-সমাধি-প্রজ্ঞায় যিনি শিক্ষিত হন এবং যথাযথভাবে তিনি সেই শিক্ষাকে উপলব্ধি বা হৃদয়ঙ্গম করতে দরুণ অনুগামীদেরকে অসদ্ধর্ম হতে সদ্ধর্মে প্রতিষ্ঠা করান, মিথ্যা হতে সত্যে উপনীত করান; এভাবেই সেই সুপ্রাজ্ঞ স্থবির ভিক্ষুর দ্বারা বহুজনের হিত, সুখ, মঙ্গল ও কল্যাণ হয়।

শেয়ার করুন
আরও সংবাদ দেখুন

বুদ্ধ পূর্ণিমায় কোন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই : ডিএমপি কমিশনার

থের-মহাথের বা স্থবির মহাস্থবির বলতে যাদের বুঝায়!

আপডেট সময় ০৪:২০:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ জুলাই ২০২৩

কথামুখ: থের ও মহাথের হলো পালি শব্দ আর স্থবির ও মহাস্থবির হলো সংস্কৃত শব্দ। উভয় শব্দযুগল পালিতে যেই অর্থ প্রকাশ করে সংস্কৃতেও একই অর্থ প্রকাশ করে, এমনকি সংস্কৃত শব্দ স্থবির ও মহাস্থবির বাংলাতেও একই নাম ও অর্থবাচক। থের শব্দটি সম্ভবত ‘ঠিত’ শব্দ হতে উৎপন্ন হয়ে ‘থির’ এ পরিবর্তন হয়ে ‘থের’ হয়েছে। ‘ঠিত’ অর্থ দাঁড়ানো, অনঢ়, অবিচল; আর ‘থির’ অর্থ হলো হলো সুকঠিন, সুদৃঢ়, দীর্ঘস্থায়ী। স্থবির শব্দ ‘স্থিত’ শব্দ হতে এসেছে। ঠিত ও স্থিত একই অর্থবোধক। পালি শব্দ ঠিত বা সংস্কৃত শব্দ স্থিত’কে বাংলায় ‘স্থিত’ই বলে। পালি ‘থের’র মূল অর্থ যেমন স্থির; তেমনি সংস্কৃত ‘স্থবির’ অর্থও হলো স্থির; এবং থের ও স্থবির শব্দের পূর্বে ‘মহা’ বিশেষণ যুক্ত হয়ে মহাথের বা মহাস্থবির রূপ পরিগ্রহ করেছে। সুতরাং থের ও স্থবির= স্থির; মহাথের বা মহাস্থবির= মহাস্থবির।

বুদ্ধের সমকালীন বুদ্ধের সরাসরি শিষ্য-প্রশিষ্যগণকে ‘থের’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। কেননা, তারা স্থির। কোন অর্থে স্থির? মানসিক-বাচনিক-কায়িক সুকর্ম সম্পাদনকারী অর্থে স্থির; তৃষ্ণার নিরবশেষ সমূলে বিধ্বংস করে নৈর্বাণিক সুখ অধিগত করার অর্থে স্থির; পাপে ভয় ও লজ্জাশীল অর্থে স্থির; ন্যায়নিষ্ঠতা ও মৈত্রী-করুণা-মুদিতা-উপেক্ষার আচরণশীলতায় স্থির; বুদ্ধের শিক্ষা অনুসারে চতুরার্য সত্যে প্রতিষ্ঠিত অর্থে স্থির; আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ প্রতিপালন ও সম্পাদনকারীতায় স্থির। উপরোক্ত অর্থে স্থিরতা বা মহা-স্থিরতায় যারা সুপ্রতিষ্ঠিত তারাই প্রকৃত অর্থে বুদ্ধবাণি অনুযায়ী থের বা মহাথের অভিধার পূর্ণাঙ্গ উপযুক্ত পাত্র।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণে থের শব্দের অর্থ কিন্তু প্রাচীন, জ্যেষ্ঠ, অগ্রজ, পূর্বজ, আদি প্রভৃতি। বিশেষভাবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণের থের বা স্থবির শব্দের অর্থের সাথে বিনয়গত বা গুণগত থের’কে হুবহু এক মনে করার কারণ নেই।

থের – মহাথের’র প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য:

উপরোক্ত প্রাচীন, অগ্রজ, আদর্শ-নৈতিকতা প্রভৃতির বিচারে গবেষক-পণ্ডিতগণ তিন প্রকারের মহাথেরর কথা উক্ত করেছেন।

যথা—
(১). জাতি মহাথের: জন্মগত বয়স বা বার্ধক্য হেতু যারা মহাথের/মহাস্থবির পদবাচ্য।
(২). সম্মুতি (সম্মতি) মহাথের: উপসম্পদার বয়স ভিত্তিতে দশ বছর অতিক্রান্ত হলে বলা হয় থের, এবং উপসম্পদার বয়স ভিত্তিতে কুড়ি বছর অতিক্রান্ত হলে মহাথের বলা হয়। অর্থাৎ, কোনও ব্যক্তি উপসম্পদা বা ভিক্ষু জীবন গ্রহণ করে এক নাগাড়ে দশ বছর ভিক্ষু জীবন অতিবাহিত করলে তাকে বলা হয় থের এবং কুড়ি বছর অতিবাহিত করলে তাকে বলা হয় মহাথের। সচরাচর ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত থের-মহাথের বরণোৎসব বা অভিধা প্রদান উৎসবগুলো ‘সম্মুতি’ কেন্দ্রিক। এখানে সম্মুতি বলতে সীমাঘরে সাঙ্ঘিক বিনয়কর্ম করে সঙ্ঘের সম্মতিতে ‘থের’ বা ‘মহাথের’ অভিধা প্রদান করাই হলো সম্মুতি মহাথের।
(৩). ধর্ম (ধম্ম) মহাথের: ধর্ম মহাথের বলতে পূর্বোক্ত আদর্শ-নৈতিকতা ভিত্তিক। আদর্শ ও নৈতিকতা ভিত্তিক ‘থের’ই যেহেতু প্রধানতম থের সেহেতু সেই বিষয়ে বুদ্ধের মূলোপদেশ হতে কিছু কথকতা এই নিবন্ধটি বিশেষভাবে দাবি রাখেই বৈ কি।

শুধুমাত্র ওয়া বা বর্ষাবাসের বাড়লেই কী থের মহাথের হওয়া যায়? :অঙ্গুত্তর নিকায়ের চতুর্থ নিপাতের প্রথম পঞ্চাশকের অধিভূক্ত উরুবেলা বর্গের দ্বিতীয় সূত্র এ বুদ্ধ স্থবিরকরণ বা থেরকরণ ধর্ম চার প্রকার বলে বলেছেন। এ বিষয়ে বক্ষ্যমাণ উরুবেলা বর্গে ব্যক্ত হয়েছে— বুদ্ধ যখন বুদ্ধত্ব লাভের পর নৈরঞ্জনা নদী তীরের অজপাল ন্যাগ্রোধ বৃক্ষমূলে অবস্থান করছেন, তখন কিছু বৃদ্ধ-মধ্য-প্রাপ্ত বয়স্ক, জ্ঞানী ও সম্মানিত ব্রাহ্মণ বুদ্ধের নিকট এসে বুদ্ধকে অনুযোগ করলেন যে, বুদ্ধ বৃদ্ধ-মধ্য-প্রাপ্ত বয়স্ক, জ্ঞানী ও সম্মানিত ব্রাহ্মণদের সম্মান-অভিবাদন-শ্রদ্ধা করেন না। এই অনুযোগের উত্তরে বুদ্ধের অভিব্যক্তি ছিলো: “যদি আশি, নব্বই কিংবা শতবর্ষী বৃদ্ধ জন্ম দ্বারা বৃদ্ধ হয় এবং তারা যদি অকালবাদী, অভূতবাদী, অনর্থবাদী, অধর্মবাদী, অবিনয়বাদী ও অকালে অর্থ, কারণ ও বিবেচনাহীন, অনর্থপূর্ণবাক্য ভাষণকারী হয় তবে তারা তো ‘মূর্খ স্থবির’ নামেই অভিহিত হবার যোগ্য। আবার যদি কোন অল্পবয়স্ক যুবক কালো কেশধারী, ভদ্রযৌবনে সমন্বিত এবং প্রথম বয়স হতেই কালবাদী, ভূতবাদী, অর্থবাদী, ধর্মবাদী, বিনয়বাদী ও যথাকালে অর্থ সমন্বিত কারণ সমন্বিত ও বিবেচনাযুক্ত, অর্থপূর্ণবাক্য ভাষণকারী হয় তাহলে তারাই তো ‘পণ্ডিত স্থবির’ সংজ্ঞায় অন্তর্ভূক্ত। তদ্বেতু তিনি অভিমত প্রকাশ করেছিলেন— স্থবিরকরণ ধর্ম চার প্রকার। যথা:

(১). যেই ভিক্ষু শীলবান, প্রাতিমোক্ষ সংবরসংযুক্ত, আচার-গোচরসম্পন্ন, বিন্দুমাত্র পাপ করতেও ভয় পায়, শিক্ষাপদ সমূহ গ্রহণ করে ও শিক্ষা করে তিনিই যথার্থ ‘স্থবির’।
(২). যিনি শ্রুতিধর, শ্রুতিসঞ্চয়ী ও বহুশ্রুত তিনিই যথার্থ ‘স্থবির’।
(৩). যিনি আদি-মধ্য-অন্ত (শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা) কল্যাণময়, অর্থ সমন্বিত পরিপূর্ণ ব্রহ্মচর্য ধর্মসমূহ দ্বারা বহুশ্রুত, তৃপ্ত, অভিজ্ঞ, উপলব্ধিপ্রবণ ও প্রাজ্ঞ হয় তিনিই যথার্থ ‘স্থবির’।
(৪). যিনি প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয়-চতুর্থ ধ্যানলাভী হন, যিনি স্বীয় অভিজ্ঞতায় সদ্ধর্ম উপলব্ধি করেন, যিনি আসব ক্ষয় করে অনাসক্ত হয়ে চিত্ত বিমুক্তি ও প্রজ্ঞা বিমুক্তি লাভ করে বাস করেন তিনিই যথার্থ ‘স্থবির’।

খুদ্দক নিকায় অন্তর্গত ‘ধর্মপদ’-এর ধার্মিক বর্গের ৫ ও ৬ নং (ধর্মপদের ক্রমানুসারে ২৬০-২৬১ নং গাথা) গাথায়ও উদ্ধৃত হয়েছে— মাথার চুল পাকলে কেউ স্থবির হয় না, তার বয়স পরিপক্বতা ও বার্ধক্য নিরর্থক। যাঁর মধ্যে চারি আর্যসত্য, নবলোকুত্তর ধর্ম, অহিংসা, সংযম ও ইন্দ্রিয় সংবরণ বিদ্যমান, যিনি নির্মল চরিত্র ও জ্ঞানবান তিনিই ‘স্থবির’ অভিধার উপযুক্ত।

অযোগ্য ও যোগ্য থের-মহাথের :

অঙ্গুত্তর নিকায়ের পঞ্চক নিপাতের স্থবির (থের) বর্গের অন্তর্গত সূত্রে উল্লেখ হয়েছে— যে সকল স্থবির ভিক্ষুগণ প্রলোভনের দ্বারা প্রলুব্ধ, দূষণের দ্বারা দূষিত, সম্মোহনের মাধ্যমে মোহাচ্ছন্ন, ক্রোধের মাধ্যমে বিক্ষুব্ধ, উন্মত্ততার মাধ্যমে প্রমত্ত; রাগ-দ্বেষ-মোহ সম্বলিত, পরের গুণবিনাশী, বিদ্বেষ পরায়ণ; প্রতারক, ভাগ্য গণনাকারী, যেখানে যেই বাক্য ভাষণ করলে লাভ হবে সেখানে সেই বাক্য ভাষণ করে (লাভ-সৎকারের জন্য চাটুকারী করেন), ফাঁকিবাজ, লাভের দ্বারা লাভ অন্বেষী; অশ্রদ্ধাবান, পাপের প্রতি ভয় ও লজ্জাহীন, অলস ও মূর্খ; রূপ-শব্দ-গন্ধ-রস ও স্পর্শের প্রতি ঈর্ষাকাতর-অসহনশীল— এই সকল অভ্যাসকারী-চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন স্থবির ভিক্ষুগণ সব্রহ্মচারীগণের নিকট অপ্রিয়, অমনোজ্ঞ, গৌরবহীন ও শ্রদ্ধার অযোগ্য হয়।

অন্যদিকে যে সকল স্থবির ভিক্ষুগণ প্রলোভনের দ্বারা প্রলুব্ধ নন, দূষণের দ্বারা দূষিত নন, সম্মোহনের মাধ্যমে মোহাচ্ছন্ন নন, ক্রোধের মাধ্যমে বিক্ষুব্ধ নন, উন্মত্ততার মাধ্যমে প্রমত্ত নন; বীতরাগ, বীতদ্বেষ, বীতমোহ, পরের গুণ বিনাশ করে না-পরচর্চা করে পরের গুণকে ধ্বংস করে না; প্রতারক হন না, ভাগ্য গণনাকারী হন না, যেখানে যেই বাক্য ভাষণ করলে লাভ হবে সেখানে সেই বাক্য ভাষণ করেন না (লাভ-সৎকারের জন্য চাটুকারী করেন না), ফাঁকিবাজ নন, লাভের দ্বারা লাভ অন্বেষীও নন; শ্রদ্ধাপরায়ণ, পাপের প্রতি ভয় ও লজ্জা সম্পন্ন, বীর্যবান ও প্রজ্ঞাবান; রূপের প্রতি ধৈর্যশীল, শব্দের প্রতি ধৈর্যশীল, রসের প্রতি ধৈর্যশীল ও স্পর্শের প্রতি ধৈর্যশীল সেই সকল স্থবির ভিক্ষুগণ সব্রহ্মচারীগণের নিকট প্রিয়, মনোজ্ঞ, গৌরবনীয় ও শ্রদ্ধার উপযুক্ত।আবার এও ব্যক্ত হয়েছে যে— অর্থ, ধম্ম, নিরুক্তি ও প্রতিভান— এই চার প্রকার প্রতিসম্ভিদা প্রাপ্ত স্থবির, সব্রহ্মচারীদের ছোট-বড় কাজে যিনি সুদক্ষ ও কর্মঠ এবং পরিশ্রমী; উপায়কুশলী ও অপরকে উপায়কুশলী হতে সহায়তাকারী সেই সকল স্থবিরগণ সব্রহ্মচারীগণের নিকট প্রিয়, মনোজ্ঞ, গৌরবনীয় ও শ্রদ্ধার উপযুক্ত। যেই স্থবির ভিক্ষুগণ প্রাতিমোক্ষ (ভিক্ষু বিনয়) সংবরে সংযত, আচার ও গোচর সম্পন্ন অর্থাৎ আচরণ-ইন্দ্রিয়-খাদ্যদ্রব্য-বাসস্থান প্রভৃতির প্রতি যথাযথ ভূমিকায় নিয়ে সুশৃঙ্খলতায় সুসমৃদ্ধ, বিন্দুমাত্র নিন্দনীয় আচরণেও ভয়দর্শী, বিনয়ানুগ শিক্ষাপদ সমূহ আয়ত্ত করে সচ্চরিত্র ও সুচরিত্রবান হবার প্রয়াসী; যিনি বহুশ্রুত, শ্রুতিধর, শ্রুতি সঞ্চয়ী; যিনি আদি কল্যাণ শীলে-মধ্য কল্যাণ সমাধিতে-অন্তে কল্যাণ প্রজ্ঞায় শ্রুতিবান-ধৃতিমান হয়; উক্ত আদি-মধ্য-অন্ত কল্যাণপ্রসূ শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার বিষয় যাঁর কণ্ঠস্থ ও মনের দ্বারা প্রত্যক্ষ বা উপলব্ধিকৃত; যিনি কল্যাণভাষী ও আন্তরিকভাষী, বাচনিক শিষ্টতায়, স্পষ্ট উচ্চারণে, পরিষ্কার কণ্ঠে এবং অর্থব্যাখ্যায় সুদক্ষ, ধ্যানলাভী, চিত্ত বিমুক্তি ও প্রজ্ঞাবিমুক্তি লাভী তিনি সব্রহ্মচারীগণের নিকট প্রিয়, মনোজ্ঞ, গৌরবনীয় ও শ্রদ্ধার উপযুক্ত।অঙ্গুত্তর নিকায়ের পঞ্চক নিপাতের স্থবির বর্গের আট নং সূত্র ‘স্থবির সূত্র’-এ কিভাবে একজন স্থবির ভিক্ষু কিভাবে অনেকের সুখ-দুঃখ, কল্যাণ-অকল্যাণের কারণ হয় তদ্বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একজন স্থবির ভিক্ষু কিভাবে অনেকের দুঃখ ও অকল্যাণের কারণ হয় সে বিষয়েও বলা হয়েছে— একজন স্থবির ভিক্ষু, যিনি দীর্ঘদিন-রাত্রি যাবত প্রব্রজ্যিত থাকেন, সুপরিচিত ও যশস্বী হন, অনেক গৃহি ও প্রব্রজ্যিত তার অনুগামী-অনুসারী হন; বুদ্ধের শিক্ষা তিনি কণ্ঠস্থ করেন, শীল-সমাধি-প্রজ্ঞায় যিনি শিক্ষিত হন কিন্তু যথাযথভাবে তিনি সেই শিক্ষাকে উপলব্ধি বা হৃদয়ঙ্গম করতে না পেরে তিনি ভ্রান্তভাবে, মিথ্যাদৃষ্টিগতভাবে ধর্ম শিক্ষা দেন, সদ্ধর্ম হতে বিচ্যুত করে লোকেদেরকে অসদ্ধর্মে প্রতিষ্ঠিত করান। বহুদিন ধরে বুদ্ধ বস্ত্র ধারণ করার দরুণ, লোকেদের দ্বারা বিবিধপ্রকারে সম্মান সৎকার লাভ করার দরুণ বহু লোক, বহু প্রব্রজ্যিত তাকে অনুসরণ করেন এবং তাঁর উপদেশ শ্রবণ করেন। সেই রকম স্থবির ভিক্ষুর যারা অনুসারী তারা তাঁর মিথ্যাদৃষ্টিকে গ্রহণ করে নিজেদের জন্য দুঃখ উৎপন্ন করেন ও অকল্যাণকে আহ্বান করেন।পরিশেষ: মধ্যম নিকায়ের ২২ তম সূত্র ‘অলগর্দোপম সূত্র’-এ এই প্রকৃতির বিষয়কে অভিজ্ঞ সাপুড়িয়া দ্বারা ব্যর্থভাবে বিষধর সাপ ধরার মতোন তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি বুদ্ধের উপদেশাদি যথাযথভাবে প্রজ্ঞাদ্বারা পরীক্ষা-উপ-পরীক্ষা-অনুপরীক্ষা না করে আচরণ-অনুসরণ-অনুশীলন করে তবে সেই ব্যক্তি বুুদ্ধের শিক্ষায় অভিজ্ঞ হলেও প্রজ্ঞাদ্বারা পরীক্ষা-উপ-পরীক্ষা-অনুপরীক্ষা না করার দরুণ তিনি যথাযথভাবে সদ্ধর্ম উপলব্ধি না করে আচরণ করতে যান এবং তা তার দুঃখের কারণ হয়; যেমন সাপুড়িয়া অভিজ্ঞ হলেও সাপের যথাস্থানে, উপযুক্তভাবে ধরতে না পারার দরুণ সর্প দংশনে সাপুড়িয়ার দুঃখ উৎপন্ন হয়।

অপরপক্ষে স্থবির ভিক্ষু যদি দীর্ঘদিন-রাত্রি যাবত প্রব্রজ্যিত থাকেন, সুপরিচিত ও যশস্বী হন, অনেক গৃহি ও প্রব্রজ্যিত তার অনুগামী-অনুসারী হন; বুদ্ধের শিক্ষা তিনি কণ্ঠস্থ করেন, শীল-সমাধি-প্রজ্ঞায় যিনি শিক্ষিত হন এবং যথাযথভাবে তিনি সেই শিক্ষাকে উপলব্ধি বা হৃদয়ঙ্গম করতে দরুণ অনুগামীদেরকে অসদ্ধর্ম হতে সদ্ধর্মে প্রতিষ্ঠা করান, মিথ্যা হতে সত্যে উপনীত করান; এভাবেই সেই সুপ্রাজ্ঞ স্থবির ভিক্ষুর দ্বারা বহুজনের হিত, সুখ, মঙ্গল ও কল্যাণ হয়।